সর্বশেষ সংবাদ :

পরিত্যক্ত, বিদ্যুতবিহীন মিল থেকে সরকারি চাল সংগ্রহ

স্টাফ রিপোর্টার, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে সরকারি মূল্যে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ক্ষেতলাল উপজেলা খাদ্য বিভাগ, মিল মালিক ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। খাদ্য বিভাগ কোনো প্রকার সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই স¤পূর্ণ পরিত্যক্ত, অচল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিহীন সহ অস্তিত্বহীন হাসকিং চাতাল ও অটো রাইচ মিলের নামে বিপুল পরিমাণ চাল সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ভাবে আমন চাল সংগ্রহ মৌসুমে ক্ষেতলাল উপজেলা খাদ্য বিভাগ উপজেলার বিভিন্ন মিলারদের মাধ্যমে ২ হাজার ২৯০ মে. টন সিদ্ধ চাল এবং কৃষক পর্যায়ে ১১১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া এই সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। আর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য উপজেলা খাদ্য বিভাগ ৪১টি সম্পুর্ণ পরিত্যক্ত ও অচল হাসকিং চাতাল ও ৪টি অটো রাইচ মিলকে সচল দেখিয়ে বরাদ্দ তালিকা প্রস্তুত করে। সেই বরাদ্দ তালিকা মোতাবেক ৪১টি হাসকিং চাতাল থেকে গড়ে ১১ দশমিক ৮২০ মে. টন করে সিদ্ধ চাল এবং ৪টি অটো রাইচ মিল থেকে মোট ১ হাজার ৭৬৮ মে. টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের চুক্তি করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বরাদ্দ পাওয়া তালিকাভুক্ত সেই ৪১টি হাসকিং চাতালের একটিও বর্তমানে চালু নেই। অধিকাংশ চাতাল গত ৭-৮ বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেইসব মিলের কোনো অস্তিত্বই নেই, আবার কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢাকা শুধু পরিত্যক্ত ভবন পড়ে আছে। আবার অনেক চাতালে হাসকিং বয়লার তো দূরের কথা, বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত নেই। কোথাও আবার চাতালের জায়গায় খড়ের পালা রেখে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে বরাদ্দ পাওয়া তালিকাভুক্ত অটো রাইচ মিলগুলোর ক্ষেত্রেও। চারটি অটো রাইচ মিলের মধ্যে মেসার্স চৌধুরী অটো রাইচ মিল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মিলটি গত ২০২২ সাল থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে মিলে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অথচ এই অচল মিলের নামেও সরকারি খাদ্য গুদামে বিপুল পরিমাণ চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মিল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব বন্ধ ও অস্তিত্বহীন মিলের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও কয়েকজন মধ্যস্বত্বভোগী যোগসাজসের মাধ্যমে বিভিন্ন হাট বাজার থেকে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছে। এতে প্রকৃত সচল মিল মালিক ও সৎ ব্যবসায়ীরা সরকারি বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা খাদ্য অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নামসর্বস্ব মিলের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, খাদ্য বিভাগ কোনো ধরনের সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই কীভাবে অচল ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিহীন মিলের নামে সরকারি চাল সংগ্রহের তালিকা প্রণয়ন করা হলো। এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য বিভাগ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচল মিল মালিকরা।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল উপজেলা মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শওকত চৌধুরী বলেন, বরাদ্দ সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কোন মিল সচল আর কোন মিল অচল, সেটি দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
ক্ষেতলাল উপজেলা খাদ্য গুদাম সূত্র জানায়, চলতি সংগ্রহ মৌসুমে ইতোমধ্যেই ১ হাজার ৪৫১ মে. টন চাল সংগ্রহ স¤পন্ন হয়েছে। তবে তার একটি বড় অংশের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
ক্ষেতলাল উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শামীমা আখতার অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন এবং সময় স্বল্পতার কারণে সরেজমিনে পরিদর্শন ছাড়াই তাকে বরাদ্দ তালিকা প্রস্তুত করতে হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সব নিয়ম মেনেই বরাদ্দ বণ্টন করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) শাকিল আহমেদ বলেন, আমন মৌসুমে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। খাদ্য অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়ার জন্য মিল সচল থাকা, বৈধ লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করে সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া তালিকা প্রণয়ন করে থাকলে তার দায় তাকেই নিতে হবে।


প্রকাশিত: December 30, 2025 | সময়: 12:59 am | সুমন শেখ