, , ।
স্টাফ রিপোর্টার, বাগমারা: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ৪০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দুই দফা চিঠি দিলেও কাজ হয়নি। নিরুপায়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে একজন ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড আবেদন করলেও তিন মাসেও পাওয়া যায়নি।
এজন্য উচ্ছেদ কাজ আটকে আছে। হতাশ হয়ে অবৈধ দখলদারদের প্রভাবশালী উল্লেখ করে স্থানীয়রা প্রধান উপদেষ্টা বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়াতে সৃষ্টি যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অভিযোগকারীদের সংশয় প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য হস্তক্ষেপে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি চিঠি দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে দাবি করা হয়েছে তাদের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ দখলকারীদের সাতজন জানান, জায়গাগুলো তাঁদেরই ছিল, পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিগ্রহণ করে। সামনে ফাঁকা থাকলে তাঁরা সেখানে স্থাপনা গড়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা বরাবর দেওয়া আবেদন ও সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবানীগঞ্জ বাইপাস সড়কের কলেজ মোড় থেকে পূর্ব ও পশ্চিমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। একটি মাদ্রাসাসহ ৪০টি স্থাপনা গড়ে উঠেছে সরকারি জমিতে।
ভবানীগঞ্জ এলাকার লোকজন জায়গাগুলো দখল করে দোকানপাট, পাকা বাড়ি, বেসরকারি হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দখলকারীদের অনেকে স্থাপনাগুলো ভাড়া দিয়ে মাসে হাজার হাজার টাকা তুলছেন।
সরেজমিনে গিয়ে সড়কের পাশে পাকা ও আধাপাকা ভবন ও দোকানঘর চোখে পড়ে। সড়কের পাশে মোহনা নার্সিং হোম নামের একটি বহুতল বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। যার অর্ধেক রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে বলে চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ। এর উল্টো দিকে রয়েছে একটি পাকা বাড়ি ও ইটের প্রাচীর।
ভবানীগঞ্জ সরকারি কলেজ রোডে রাস্তার উভয় পাশে দেখা যায় একটি মাদ্রাসা, পাকা, আধা পাকা ভবন। এগুলোতে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কলেজ মোড়েই সড়ক দখল করে চোখে পড়ে দোতলার পাকা ভবন। নিচ তলায় রয়েছে ১৪০০ স্কয়ার ফিটের মা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের দোকান। এর ভাড়াটে কমল কুমার বলেন তিনি আইরিন যুথি এই ভবনের মালিক। তাঁর কাছ থেকে মাসিক ভাড়ায় দোকানঘরটি নিয়ে ব্যবসা করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ ভবানীগঞ্জ কলেজ মোড়ের আশপাশের জায়গা দখলের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে যানজন নিরসনের জন্য দুই শতাধিক স্থানীয় লোকজনের স্বাক্ষর করা একটি লিখিত অভিযোগ গত বছরের ২৩ নভেম্বর রাজশাহী জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া হয়।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আলাদা তদন্ত করে ৪০ জনের মোট ৪০টি স্থাপনা শনাক্ত করা হয়। তীব্র যানজটের বিবরণ দিয়ে ও অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গত ১৮ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন সদ্য বদলি হওয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদ হোসেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভবানীগঞ্জের ২৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১.৬১ একর জমি দখল করে ৪০টি স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এ পরিমাণ জমির দাম প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
দখলকারীদের মধ্যে রয়েছেন আবদুস সাত্তার, হেলাল হোসেন, কামাল হোসেন, ফজেল, আবদুর রাজ্জাক, মৌসুমী খাতুন, আইরিন যুথি, ফজলুর রহমান উল্লেখযোগ্য। এঁরা রাজনৈতিক দলের কোনো পদে না থাকলেও স্থানীয় ভাবে প্রভাবশালী।
দখল প্রসঙ্গে আবদুস সাত্তার ও কামাল হোসেন বলেন, যে স্থাপনা শনাক্ত করে উচ্ছেদের চিঠি দেওয়া হয়েছে এর মধ্য আমাদেরও জমি আছে, আমরা ঘরবাড়ি করে বসবাস করছি। তাঁদের হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অভিযোগ করছে। একই রকম কথা বলেছেন অন্যরাও। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা প্রভাবশালী নন, জমিগুলো তাঁদের পৈত্রিক ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহীর দপ্তর থেকে নিজ নিজ খরচায় দখলদারদের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দফা নোটিশ দিলেও কাজ হয়নি। দখলদারেরা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন। নিরুপায়ে গত ২০ এপ্রিল রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রকাশের কাছে আবেদন করেন। তবে তিন মাসেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহীর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তাঁরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারেন না। তবে উচ্ছেদের জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাড়া পাওয়া যায়নি, পেলে উচ্ছেদ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন, মতলেবুর রহমান, নাজমুল হোসন বলেন, কলেজমোড়ের আশপাশে অবৈধ স্থাপনার কারণে উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জে প্রবেশ মুখ কলেজ মোড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে। এতে শিক্ষার্থী ছাড়াও লোকজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাঁরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানান। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে স্থাপনা উচ্ছেদে কালক্ষেপণ করছেন। নিরুপায়ে প্রধান উপদেষ্টাকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এই বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) উম্মে কুলসুম সম্পার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বক্তব্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তাতেও সাড়া দেননি তিনি।