, , ।
ইবতিদা ফেরদৌস: টানা বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাঠের সবজি। এর প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর বাজারগুলোতে। সাহেব বাজার, শিরোইল কাঁচাবাজার উপশহর বাজার সহ ছোট বড় প্রায় সব জায়গায়ই একই চিত্র। ৬০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই বললেই চলে। মাছ-মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই, দাম আকাশচুম্বী। শনিবার (৩০ আগস্ট) সকালে সাহেব বাজার ঘুরে দেখা গেল, ক্রেতারা ভিড় করছেন ঠিকই, কিন্তু দাম শুনে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে দাম।
রাজশাহীর সাহেব বাজারে করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা কয়েক সপ্তাহ আগে ছিল মাত্র ৩০ টাকা। পটল ৬০ টাকা, কাকরুল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা এবং বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের দাম ছিল ৬০ টাকা। শসা ৮০, ঝিঙ্গা ৮০, আর পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে—যা গত মাসেও ৫৫ টাকার মধ্যে ছিল। কাঁচামরিচের দাম উঠেছে ১৬০ টাকায়। পেঁপে তুলনামূলক সস্তা, কেজি ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা কেজি, লাউ ৬০ টাকা পিস, বরবটি ১০০ টাকা, পুইশাক ৪০ টাকা আঁটি, আদা মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, রসুন ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, টমেটো ১৬০ টাকা এবং ফুলকপি ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শিরোইল কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মামুন বলেন, বৃষ্টির কারণে গ্রামের খেতের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। আগে প্রতিদিন তিন-চার ট্রাক সবজি আসত, এখন আসছে অর্ধেক। সরবরাহ কমলে দাম তো বাড়বেই।
উপশহর বাজারের আরেকজন বিক্রেতা বলেন, ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সবজি আনতে গেলে এখন অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে গেছে। আমরা তো লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে পারি না। রাজশাহীর বাজারে মাছের সরবরাহ কম। দেশি মাছগুলো খুবই কম পরিমাণে এসেছে, দামও বেশি।
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি। চিংড়ি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। ১ কেজি ওজনের রুই ও কাতলা আগে ছিল ২৫০ টাকা, বর্তমানে ২৮০ টাকা। বড় পাঙাশ বিক্রি ২৫০, যা আগে ছিল ১৮০ টাকা। সিলভার কার্প বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২৫০ টাকায়। একই বাজারে মুরগির দামও বেড়েছে। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকায়, ব্রয়লার ১৭০ টাকায়, লেয়ার ২৫০ টাকায় এবং হাঁস ৪২০ টাকায়।
এদিকে মাছের আমদানি কম থাকায় বাড়ছে মাছের দাম দাবি সাহেব বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের। মাছ বিক্রেতা লতিফ মিয়া বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে মাছের আমদানি অনেক কমেছে। বিশেষ করে বড় মাছ চাষের পুকুরে পানি উঠে গেছে। তাই দাম বাড়ছে। অন্য এক মাছ বিক্রেতা বাবুল হোসেন বলেন,আমরা তো চাষিদের কাছ থেকেই কিনি। সেখানে দাম না কমলে আমরা কী করবো? চিংড়ি বা রুই সবই এখন আগুন দাম। অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ ইচ্ছেকৃত ভাবে বাড়ানো হচ্ছে সবজির দাম। সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা এক ক্রেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আগে ৫০০ টাকায় এক সপ্তাহের সবজি হতো, এখন ১ হাজার টাকাতেও ঠিকমতো হচ্ছে না। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জন্য বাজার করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। শিরোইল কাঁচাবাজারে এক গৃহিণী বলেন, সবজির দাম একদিনে একরকম, পরদিন আরেক রকম। পেঁয়াজ গতকাল ছিল ৭০ টাকা, আজ ৮০ টাকা। টমেটো ১৬০ টাকা এটা কি সাধারণ মানুষের কেনার মতো? বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম বাড়ার মূল কারণ হলো টানা বর্ষণে মাঠের সবজি নষ্ট হওয়া। পাশাপাশি পরিবহন সমস্যা, মহাসড়কের খারাপ অবস্থা এবং বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাবও দামের ঊর্ধ্বগতির জন্য দায়ী। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজারে কিছুদিন সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি কম থাকায় সবজির দাম ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এখন সেই অবস্থা আর নেই। ফলে একের পর এক হাতবদলের মাধ্যমে বাড়ছে দাম ।
রাজশাহী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মোসাঃ রোজিনা আফরোজ বলেন, চলমান বর্ষায় সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং সুষম আমদানি-রপ্তানি নীতি।