দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন: নওগাঁর ভূমি কর্মকর্তা কল্লোলের সম্পদের হিসেব নিবে কে?

নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁ শহরের খাগড়া এলাকায় চার কাঠা জমি কেনার জন্য মাসুদ নামের এক মাধ্যমকে এক লাখ ২৭ হাজার টাকা বায়না দিয়েছিলেন এক ক্রেতা। আশা ছিল তার ভাগ্যে জুটবে শহরের ওই জমিটি। বিভিন্ন অজুহাতে রেজিস্ট্রি করে দিতে দেরি হওয়ায় তাগাদা দিতে থাকেন দরিদ্র ওই ক্রেতা। এরপর তার ভাগ্যে আর জোটেনি সেই জমি। খাজনা দিতে গেলে কাগজ আটকিয়ে দেয় কল্লোল। এক পর্যায়ে জানতে পারে কল্লোল বেশি দামে সেই জমিটি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে।
তবে হুমকি দিয়ে তার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এভাবেই বলছিলেন আইয়ুব হোসেন নামের ওই ক্রেতা। এসময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সেই জমিটি দেখিয়ে দিয়ে বলেন, অনেক কষ্টে বাড়ির ছাগল-গরু বিক্রি করে টাকাটা দিয়েছিলাম কেনার আশায়। আরও বেশ কিছু জমি দেখিয়ে দিয়ে বলেন, কল্লোল ও তার বেয়াই ভোগদখল করে খাচ্ছে।
বলছিলাম এক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান কল্লোলের কথা। বর্তমানে তিনি জেলার মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানির প্রচুর অভিযোগ আছে। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় কল্লোল আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এছাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সমিতির কেন্দ্রীয় ও রাজশাহী বিভাগের নেতা হওয়ায় কল্লোল কাউকেই তোয়াক্কা করতেন না।
সেই জন্য নওগাঁর সদর থানার বোয়ালিয়া-তিলকপুর এবং পরবর্তীতে নওগাঁ পৌরসভা-চন্ডিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। খারিজ-খাজনা ও জমি-জমা সংক্রান্ত কোনো কাজ করতে গেলেই তাকে দিতে হতো অতিরিক্ত টাকা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে, সেই কাজ তিনি শুরুই করতেন না বলেও অভিযোগ করেন একাধিক ভূক্তভোগী। টাকার বিনিময়ে খাস জমিও বৈধ করে দেওয়ার অভিযোগ আছে। আর এই ভাবেই অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। গড়েছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
একজন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হয়ে কিভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সম্ভব এমন প্রশ্নই এখন পুরো নওগাঁ জুড়ে। তাই নতুন বাংলাদেশে এমন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চায় ভুক্তভোগীসহ সচেতনরা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁ শহরের স্টাফ কোয়ার্টারের বিপরীতে প্রায় ৩ কাঠা জমি ওপর দু’কোটি টাকা মূল্যের ৫ তলা বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন কল্লোল। এছাড়া সদর উপজেলার চকদেব মৌজায় ২৫ দশমিক ৩০৫ শতক, চকপ্রাচী মৌজায় ৪১ দশমিক ৫ শতক, চকবাড়িয়া মৌজায় ৮ দশমিক ৩৫ শতক, খাগড়া মৌজায় রয়েছে ২৩৪ দশমিক ৫ শতক, বাঙ্গাবাড়িয়া মৌজায় রয়েছে ৮ দশমিক ২৫ শতক এবং আরজি-নওগাঁ মৌজায় রয়েছে ১৭ দশমিক ৬৬ শতক জমি। এসব জমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা।
তবে ভূমি কর্মকর্তা কল্লোলের দাবি তিনি আয়কর বাবদ ৬৮ হাজার টাকা দিয়েছেন। এদিকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নামে বেনামে আরও জমি আছে বলে একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ। তার দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সকল সম্পত্তি সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান অনেকে। অপরদিকে শহরের নওজোয়ান টাওয়ারে প্লট আকারে জমি রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। তাই বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বদলী হওয়া মহাদেবপুরের রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য গেলে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মৌদুদুর রহমান কল্লোল উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি কিছু বলবেন না। তবে তিনি একাধিক সময় গর্বের সাথে বলেছেন, এসব করে কি হবে? তেমন কিছুই হবেনা। আমি সরকারকে ৬৮ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছি। তারপরও শেষে বৈরীতা সৃষ্টি না করে তিনি একটি সমাধানে আসার অনুরোধ জানান।
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা জানান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মৌদুদুর রহমান কল্লোলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত একজন সিনিয়র সহকারী কমিশনারের মাধ্যমে তদন্ত চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু অভিযোগটি একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এবং অভিযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে দেয়া হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড়ই প্রভাবশালী হোক না কেন তদন্তে কোনো কিছুই প্রভাব ফেলতে পারবে না। আশা রাখি দ্রুতই তদন্ত সম্পন্ন হবে। আর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান উর্দ্ধতন এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক গোলাম মওলার কাছে বিভিন্ন দাবি নিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন নওগাঁর বৈষম্য বিরোধী শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীরা কল্লোলের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম আর সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার বিচার দাবী করে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে নওগাঁ পৌরসভা-চন্ডিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মৌদুদুর রহমান কল্লোলকে ১৯ আগষ্ট মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলী করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৪ | সময়: ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ