, , ।
স্টাফ রিপোর্টার, বাগমারা: রাজশাহীর সর্ববৃহৎ উপজেলা বাগমারা। ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলাটি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তবে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে রাসায়নিক সারের সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়ছেন কৃষকরা। সংকটের পেছনে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি কৃষির জন্য বরাদ্দ করা সার মাছ চাষ ও পানবরজে ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগমারা উপজেলায় বিএডিসি ও বিসিআইসি মিলিয়ে প্রায় ৩৩ জন সার ডিলার রয়েছেন। এসব ডিলারের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের সার কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। ডিলারদের দাবি, বাগমারার প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ও সরবরাহ কম থাকায় কোনো কোনো সময়ে বাজারে চাপ তৈরি হয়। আবার উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে পাশের নলডাঙ্গা, আত্রাই, মান্দা, মোহনপুর, পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার কৃষকরাও সার কিনতে আসেন। ফলে স্থানীয় চাহিদার বাইরে অতিরিক্ত সার চলে যাওয়ার কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সামনে রবি মৌসুমকে কেন্দ্র করে অনেক কৃষক আগাম সার কিনে বাড়িতে মজুদ করছেন। বাগমারায় রবি মৌসুমের অন্যতম প্রধান ফসল আলু ও পেঁয়াজ। এসব ফসলের জমিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাসায়নিক সার প্রয়োজন হয়। মৌসুমে সার পাওয়া যাবে কি না এমন আশঙ্কা থেকেই অনেকে আগেভাগে সার কিনে রাখছেন। এতে বাজারে একসঙ্গে চাহিদা বেড়ে গিয়ে ডিলারদের গুদামে মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ডিলারদের ভাষ্য, সরকারি সার সাধারণত মাসভিত্তিক বরাদ্দের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। কোনো মাসে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত সার সরবরাহ করা ডিলারদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে কৃষকের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সাময়িক ব্যবধান তৈরি হয়। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
সারের সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মাছ চাষ। বাগমারার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে পুকুর ও বিলে মাছ চাষ হচ্ছে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে অনেক চাষি পুকুরে রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন। অথচ মাছ চাষের জন্য কৃষির মতো পৃথকভাবে সার বরাদ্দ না থাকায় কৃষির জন্য সরবরাহ করা সারই বিভিন্নভাবে মাছ চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
একইভাবে বাগমারায় রয়েছে বিপুলসংখ্যক পানবরজ। পান চাষেও সার প্রয়োজন হয়। ফলে কৃষিজমির পাশাপাশি মাছ চাষ ও পানবরজে সার ব্যবহারের কারণে সার সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। কৃষির জন্য বরাদ্দ করা সার যদি এসব খাতে চলে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনের মৌসুমে কৃষকের চাহিদা পূরণে সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বাগমারায় সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বাজারে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে ডিলারের কাছে প্রতি বস্তা এমওপি সার ১ হাজার ৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে খুচরা পর্যায়ে কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ডিলাররা সাধারণত নির্ধারিত ব্যবস্থাপনায় সার সরবরাহ করলেও কৃষকদের অনেকেই প্রয়োজনের সময় খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সার কিনে থাকেন। ডিলার পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার না থাকলে খুচরা বাজারের ওপর চাপ বাড়ে এবং তখন বেশি দামে সার বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। ফলে শুধু ডিলারদের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা ও খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাগমারায় বিএডিসির ১৫ জন এবং বিসিআইসির ১৮ জন ডিলার রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ডিলারদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার সংগ্রহ ও সরবরাহ করেন। পাশাপাশি বেসরকারি মাধ্যম থেকেও সার সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম হলে ডিলারদের পক্ষে বাজারে পর্যাপ্ত সার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে বাগমারার সার সংকটকে শুধু ডিলারদের মজুদ বা সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃষিজমির পাশাপাশি মাছ চাষ, পানবরজ, পার্শ্ববর্তী উপজেলার ক্রেতাদের সার কেনা এবং রবি মৌসুমকে সামনে রেখে কৃষকদের আগাম মজুদের কারণে সারের চাহিদা বেড়েছে। এর বিপরীতে সার সরবরাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ালে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বাগমারার গোপালপুর গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান জানান, রবি মৌসুমে আমরা আলু পেয়াজ করে থাকি। গতবার সারের সংকটের কারণে ভালো মতন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাওয়ায় প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট ডিলাররা বলছেন, বাগমারায় চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ বাড়ানো হলে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। বিশেষ করে রবি মৌসুম সামনে রেখে আগাম চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খোলা বাজারেও পর্যাপ্ত সার পৌঁছানো গেলে কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কেনার ভোগান্তি কমবে।
এ বিষয়ে বিসিআইসি সার ডিলার আখতারুল আলম জানান, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী আমরা সার পেয়ে থাকি। তবে কৃষকের যে পরিমাণ সার প্রয়োজন সে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বরাদ্দ পেলে আর সংকট হবে না।
বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাগমারায় প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। এই জমির বাইরে মাছ চাষ এবং পান বরজ রয়েছে। যেখানে কোন সার বরাদ্দ দেয়া হয় না। এক বছরে যে পরিমাণ বরাদ্দ পেয়ে থাকি সেটা মাস অনুযায়ী ভাগ করে দেয়া হয়। রবি মৌসুমে সার বেশি প্রয়োজন হয় এই মৌসুমে সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয় হয়ে থাকে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিজু তামান্না বলেন, বাগমারা একটি কৃষি প্রধান উপজেলা। এখানে ব্যাপক সারের প্রয়োজন। ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি মাছ এবং পান চাষে অনেক সার প্রয়োজন। পান বরজ এবং মাছচাষেও অনেক সার ব্যবহার হয়ে থাকে। তাই যে এলাকায় রবি মৌসুমে চাষবাস কম হয় সেই এলাকার বরাদ্দ সমন্বয় করা হলে সারের সংকট কমানো সম্ভব। কৃষির পাশাপাশি মাছ চাষ এবং পান বরজের জন্য সারের বরাদ্দ রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্টের বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।