সর্বশেষ সংবাদ :

সিজারে প্রসূতির মৃত্যু : গোদাগাড়ী মডেল হাসপাতালের সেবা নিয়ে ফুঁসে উঠছে জনগণ

আব্দুল বাতেন: রাজশাহীর গোদাগাড়ী মডেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে গোদাগাড়ীজুড়ে। গত শনিবার ৮ আগস্ট রাতে কমলি বেগম (৩৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার মান, অপারেশন ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয় ও রিপোর্ট প্রদান, চিকিৎসক-নার্সের ভূমিকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। কেউ কেউ হাসপাতালটি বন্ধ ও সিলগালা করার দাবিও জানিয়েছেন।
এদিকে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের স্বজনরা। মঙ্গলবার ১১ আগস্ট তদন্ত কমিটি হাসপাতালে অবস্থান করছে-এমন খবর পেয়ে কমলি বেগমের স্বজনরা সেখানে গেলে তাদের তদন্ত দলের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি এবং হাসপাতালে প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত কমলি বেগম গোদাগাড়ীর পৌর এলাকার মেডিকেল মোড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। স্বজনদের অভিযোগ, সন্তান জন্মদানের আশায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সিজারিয়ান অপারেশনের সময় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কমলি বেগমের নতুন নবজাতক রেখে মারা গেলেও একটি আরো দুটি কন্যা সন্তান রয়েছেন তারা হলেন, তানিয়া খাতুন যার বয়স ৯ বছর এবং মাহবুবা ইয়াসমিন বয়স ৬। অল্প বয়সে তিন মেয়ে এতিম হওয়ায় আশেপাশের লোকজন হাসপাতালের সেবা নিয়ে আরো ফুঁসে উঠছেন।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্থানীয়দের অসংখ্য মন্তব্যে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে পূর্বের বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সোনিয়া খাতুন নামে একজন লিখেছেন, এর আগেও এমন ঘটনা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তবে এবার মৃতদেহ নিজ চোখে দেখে এসেছেন। তিনি অভিযোগ করে লেখেন, একজন সুস্থ মানুষ সন্তান জন্ম দিতে হাসপাতালে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরবেন-এটি মেনে নেওয়া যায় না। তার ভাষায়, কোনো চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার কারণে একজন মানুষের মৃত্যু হলে এর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও লেখেন, ওই ঘটনার কারণে একটি ছোট শিশু তার মাকে হারিয়েছে। চিকিৎসাসেবা মানুষের কষ্ট কমানোর জন্য হলেও অর্থের লোভ বা ভুল চিকিৎসার কারণে যদি মানুষের জীবনহানি ঘটে, তাহলে সেটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
তন্ময় নামে একজন দাবি করেছেন, এর আগেও এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং টাকা দিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আনিকা তাসনীম নামের একজন হাসপাতালের পরিচালক শামসুজ্জোহা বাবুর অপারেশন করার একটি ছবি পোস্ট করে মন্তব্য করেন, ‘সিজার করেছেন একা একা বড় ডাক্তার বাবু।’
জাহিদ হাসান নামে একজন আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, তার স্ত্রী গর্ভবতী থাকা অবস্থায় ওই হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, পেটে সন্তান নেই; বরং টিউমার রয়েছে। পরে তিনি অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করালে আগের রিপোর্ট ভুল ছিল এবং তার স্ত্রীর পেটে সন্তান রয়েছে বলে জানতে পারেন।
জাহিদ হাসান নামে একজন অভিযোগ করেন, সরকারি মেডিকেল কলেজের ওষুধ মডেল হাসপাতালের রোগীদের দেওয়া হয়। সোহেল রানা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে গেলেই সিজার করার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং কখনো কখনো পেটে পানি কম থাকার কথা বলা হয়।
বাসার ইসলাম গোদাগাড়ী নামে একজন হাসপাতালটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলে এটিকে ‘মডেল হাসপাতাল’ বলা যায় কি না-সে প্রশ্ন করেছেন।
এ ছাড়া সাইফুল ইসলাম নামে একজন হাসপাতালের রিসেপশনে থাকা কর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। ওয়াদুদ নামে একজন দাবি করেছেন, হাসপাতালে নার্সদের দিয়েই বেশি কাজ করানো হয় এবং তার এক বন্ধুর সন্তানও এর আগে সিজারের সময় মারা গেছে।
শাহানুর আলম, করিম, রুহুল আমিন, রিপন, আনারুল, আসমল সহ আরও অনেকে হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে যথাযথ তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। কেউ কেউ হাসপাতালটি বন্ধ বা সিলগালা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটি গঠন: প্রসূতি কমলি বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের কথা জানিয়েছেন রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই এই ঘটনার তদন্ত হবে। তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।’
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তদন্তের আগেই উঠছে নতুন অভিযোগ: এদিকে তদন্ত কমিটি হাসপাতালে যাওয়ার পর নিহত প্রসূতির স্বজনদের সঙ্গে তদন্ত দলের কথা বলতে না দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্বজনদের অভিযোগ, মঙ্গলবার তারা তদন্ত দলের সঙ্গে কথা বলতে ও তাদের বক্তব্য জানাতে হাসপাতালে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয়।
স্বজনদের প্রশ্ন-চিকিৎসায় কোনো অনিয়ম, অবহেলা বা ভুল হয়ে থাকলে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। তাহলে তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে না কেন?
স্থানীয়দেরও দাবি, শুধু কমলি বেগমের মৃত্যুর ঘটনা নয়, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ওঠা পূর্বের অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হোক। বিশেষ করে সিজারের সিদ্ধান্ত, অপারেশনে কারা দায়িত্ব পালন করেন, রোগীর পূর্ববর্তী ও অপারেশন-পরবর্তী চিকিৎসা নথি, ব্যবহৃত ওষুধ, রক্তক্ষরণের কারণ, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, নার্সদের দায়িত্ব এবং রোগ নির্ণয়ের রিপোর্ট-সবকিছু যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং পূর্বে একই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কি না, ঘটলে সেগুলোর নথিও পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
নিহত কমলি বেগমের স্বজন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্ত যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমনটাই চান তারা।


প্রকাশিত: August 12, 2026 | সময়: 3:02 am | সুমন শেখ

আরও খবর