এক প্রশ্নেই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

স্পোর্টস ডেস্ক: প্রশ্ন করার কথা ছিল সাংবাদিকদের! কিন্তু বৃহস্পতিবার মিরপুরের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যটা পুরো উল্টো হয়ে গেল। মিডিয়া ম্যানেজার প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই তাকে থামিয়ে দিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
মুচকি হেসে সামনে বসে থাকা সাংবাদিকদের উদ্দেশে ছুড়ে দিলেন নিজের প্রশ্ন, ‘অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা কী? শান্তর প্রশ্নে হাসির রোল পড়ে সংবাদ সম্মেলন কক্ষে। এরপর একে একে উত্তর আসতে থাকে। একজন বললেন, ‘ভালো খেলা চাই।’ সঙ্গে সঙ্গেই শান্তর পাল্টা প্রশ্ন, ‘এই উত্তর আমি দিলে আপনাদের পছন্দ হতো?’ আবারও হাসিতে ভরে ওঠে পুরো কক্ষ।
আরেকজন বললেন, ‘একটা টেস্ট ড্র করতে পারলে খুশি হব।’ আরেক সাংবাদিক মনে করিয়ে দিলেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের একটি মন্তব্য, ‘সম্মান নিয়ে ফিরতে চাই। ’ এই উত্তর শুনে শান্তর মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
হাসি-ঠাট্টার সেই কয়েক মিনিটই যেন বলে দিল, অস্ট্রেলিয়া সফরকে বাংলাদেশ কেবল একটি টেস্ট সিরিজ হিসেবে দেখছে না, এই সফরটি যেন অনেক কিছুর জবাবও! হবেই না কেন? ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে টাইগাররা। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ ক্রিকেটারের জন্য এটি একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। আর অধিনায়ক হিসেবে নাজমুল হোসেন শান্তর জন্য সফরটি বিশেষ এক গর্বেরও।
বাংলাদেশের গোল্ডেন জেনারেশনের বেশিরভাগই বিদায় নিয়েছেন। তামিম ইকবাল-সাকিব আল হাসান-মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের টেস্ট খেলা হয়নি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে মুশফিক টিকে আছেন স্বপ্ন পূরণের দ্রাড়প্রান্তে! বাংলাদেশের ক্রিকেটকে একটা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি সেই জেনারেশনের ক্রিকেটাররা যেখানে সুযোগ পাননি, সেখানে নাজমুলে হোসেন শান্তরা নিজেকে ভাগ্যবাদ ভাবতেই পারেন।
তবে শান্ত কেবল ঐতিহাসিক সফরের অংশ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান না। তার লক্ষ্য, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন ক্রিকেট খেলা, যাতে প্রতিপক্ষের সম্মান আদায় করা যায়, ‘অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়াটা আমার কাছে সত্যিই সৌভাগ্যের। আমার মনে হয়, গত ২৩ বছরে আমাদের সেখানে আরও বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়া উচিত ছিল। তবে সেটার জন্য আমাদেরও ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলতে হতো। এবার আমাদের লক্ষ্য থাকবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এমন ক্রিকেট খেলা, যাতে প্রতিপক্ষের সম্মান অর্জন করতে পারি।’
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট সংখ্যা মাত্র ছয়। এর মধ্যে চারটি হয়েছে দেশের মাটিতে, আর অস্ট্রেলিয়ায় মাত্র দুটি। ২০০৩ সালের সেই সফরে হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ আশরাফুলদের দল দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। এরপর দীর্ঘ বিরতিতে আর আমন্ত্রণই মেলেনি। অবশেষে ২৩ বছর পর আবার সেই সুযোগ এসেছে। এবার অবশ্য দলও অনেক বেশি পরিণত, অভিজ্ঞ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য রাখে।
এই কারণেই সফরটিকে ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন শান্ত, ‘আমরা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে তারা আমাদের আরও বেশি টেস্ট সিরিজে আমন্ত্রণ জানাবে। আমরা প্রতিটি ম্যাচই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলি, সেটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। তবে একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা কতটা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি এবং অস্ট্রেলিয়াকে কতটা কঠিন চ্যালেঞ্জ দিতে পারি। এই দুই টেস্টে সেটা করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বেশি সুযোগ তৈরি হবে।’
২০০৩ সালের সেই সফরের সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। ২৩ বছর পর এবারও তিনি দলের সঙ্গে যাচ্ছেন। তবে ব্যাটার হিসেবে নয়, ব্যাটিং কোচের ভূমিকায়। দুই সফরের পার্থক্য টেনে আশরাফুল বললেন, ‘২৩ বছর আগে আমরা জেতার লক্ষ্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাইনি। কিন্তু এবার আমরা যাচ্ছি টেস্ট জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। দলের প্রত্যেকেই এই সিরিজ খেলতে মুখিয়ে আছে। আশা করি, ছেলেরা ভালো ক্রিকেট খেলবে।’
২০০৩ সালে বাংলাদেশ দল যখন অস্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছিল, তখন দলের প্রত্যাশা বলতে কিছুই ছিলো না। টেস্টে বেশি সময় টিকে থাকাই যেন ছিল বড় সাফল্য। প্রত্যাশার সেই জায়গাতে বদল এসেছে ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ভক্তদের মধ্যেও। আশরাফুল যেমন বলছিলেন ২০০৩ সালে কোন প্রত্যাশা ছিলো না দলের কাছে। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। অধিনায়ক শান্তর এই প্রত্যাশাকে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন, ‘এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক যে এখন দেশের মানুষ প্রতিটি সিরিজেই আমাদের কাছে জয়ের প্রত্যাশা করে। তারা বিশ্বাস করে, আমরা প্রতিটি ম্যাচ জিততে পারি। ২৩ বছর আগে হয়তো এমন প্রত্যাশা ছিল না। এটাকেই আমি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বড় অর্জন মনে করি। আমাদের লক্ষ্যও সেটাই—প্রতিপক্ষ যেই হোক, কন্ডিশন যেমনই হোক, দ্রুত মানিয়ে নিয়ে জয়ের খেলা।’
তবে বহু প্রতিক্ষিত এই সিরিজে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যেতে পারছে না বাংলাদেশ। চোটের কারণে প্রথম টেস্ট থেকে ছিটকে গেছেন লিটন দাস, আর পুরো সিরিজেই নেই নাহিদ রানা। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নাহিদের মতো গতিময় পেসারকে না পাওয়াটা বড় ধাক্কাই। তবে ইনজুরিকে অজুহাত বানাতে রাজি নন শান্ত। টেস্ট স্কোয়াডে সুযোগ পাওয়া ক্রিকেটারদের নিয়েই লড়াইটা করতে চান শান্ত।


প্রকাশিত: July 31, 2026 | সময়: 4:07 am | সুমন শেখ

আরও খবর