, , ।
কালাই প্রতিনিধি: ঋণের বোঝা আর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে এক দিনমজুরকে বিদেশে নিয়ে কিডনি অপসারণের পর প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়ার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর একটি মামলা হয়েছে জয়পুরহাট জজ আদালতে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে কিডনি দেওয়ার কথা থাকলেও হাতে দেওয়া হয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। পরে নেপালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কিডনি অপসারণের পর দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও বাকি টাকা আর পাননি ওই ব্যক্তি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও পাওনা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।
মামলার বাদী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার এক দিনমজুর মন্টু মিয়া। গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত- ৫-এ তিনি মামলার আবেদন করেন।আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন মামলাটি কালাই থানায় এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। নামীয় আসামিরা হলেন-বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা (খাঁপাড়া) গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, উদয়পুর ইউনিয়নের লওনা (বহুতি) গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী।
ঋণের চাপকে পুঁজি করে প্রস্তাব এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, সংসারের অভাব-অনটন মেটাতে বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। এই সুযোগে স্থানীয় কয়েকজন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেয়।
তাঁকে জানানো হয়, ঢাকার এক নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন এবং তাঁর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রয়োজন। বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়।
মন্টু মিয়ার অভিযোগ, প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর অভিযুক্তরা তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করে দেয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দেয়। এরপর তাঁকে ভারত হয়ে নেপালে নেওয়া হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুত বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর দেওয়া হয়নি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে একাধিকবার পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের অনুরোধ করা হলেও তারা উল্টো অর্থ লেনদেনের বিষয়টিই অস্বীকার করেন। এতে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন।
মন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, কিডনি অপসারণের পর থেকে তিনি আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন-সংক্রান্ত আইনের আওতায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, মানুষের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব বা আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে যদি কাউকে বিদেশে নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কিডনি অপসারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রতারণা নয়, অত্যন্ত জঘন্য ও সংগঠিত অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া উচিত।