সর্বশেষ সংবাদ :

নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে আলোচনা সভা

স্টাফ রিপোর্টার: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে তোলা এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক রাশেদা খালেক। এতে স্প্রিং-২০২৬ সেমিস্টারের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, বিভাগীয় প্রধানরা অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভানসিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক রাশেদা খালেক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হচ্ছে শিক্ষার্থী। তাদের ছোট্ট একটি ভুল যেমন প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে, তেমনি সেই শিক্ষার্থীর জীবনও কলুষিত হতে পারে। তাই সহপাঠীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করতে হবে। পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার মাধ্যমেই সুন্দর ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গত তিন বছর ধরে একটি অভিযোগ বক্স চালু রয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো, এ পর্যন্ত সেখানে কোনো শিক্ষার্থী অভিযোগ জমা পড়েনি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
কমিটির সদস্য বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবি সমিতির পরিচালক দিল সিতারা যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের সহজ ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, কাউকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন আঁকা, ব্ল্যাকবোর্ডে কটূক্তিমূলক লেখা, ফেসবুকে অপমানজনক স্ট্যাটাস দেওয়া, তির্যক দৃষ্টিতে তাকানো, অশোভন মন্তব্য করা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যক্তিগত বা শারীরিক বিষয় নিয়ে কৌতুক করা, অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তা পাঠানো, ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করা, কারও চলাফেরা বা পোশাক নিয়ে বিদ্রূপ করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করাকেও যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, এসব আচরণ অনেক সময় মজা বা তুচ্ছ বিষয় বলে মনে হলেও তা ভুক্তভোগীর মানসিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্বাভাবিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শহরের বিভিন্ন জেলায় তার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয় বিবেচনা করে আমরা প্রথমেই মামলা বা আইনের আশ্রয় নিই না; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করি। তিনি আরও জানান, কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি যৌন হয়রানিমূলক অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে এবং প্রমাণিত ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কমিটির সদস্য সচিব ড. নাসরিন লুবনা সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি মানবসত্তার মর্যাদা, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলেছেন, যা নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। তিনি বলেন, নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে আইনি সচেতনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অত্যন্ত জরুরি।
অভিযোগ দাখিলের নিয়ম সম্পর্কে তিনি জানান, কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর কমিটি বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকে নিয়ে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক শৃঙ্খলা ও ভুক্তভোগীর মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কমিটি দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীলভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তির চেষ্টা করে।
কামরুন্নাহার বলেন, একটি শিশুর সামাজিকীকরণ প্রথমে পরিবার থেকেই শুরু হয়। পরিবারে সে আচরণ, মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও নৈতিক শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি অর্জন করে। পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই মূল্যবোধকে আরও বিকশিত ও সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী যদি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় জায়গা থেকেই মানবিকতা, সহমর্মিতা ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা পায়, তাহলে সমাজে যৌন হয়রানি, সহিংসতা ও বৈষম্যের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
রিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, অনেক সময় সাময়িক আনন্দ বা অসচেতনতার বশবর্তী হয়ে কিছু ছেলে নারীদের উত্ত্যক্ত করে থাকে। এটি মূলত নৈতিক স্খলন ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি নারী স্বাধীনতা ও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সমাজে যখন নারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়, তখন তার সুফল পুরুষেরাও ভোগ করেন। তাই নারীদের সম্মান দিলে পুরুষের মর্যাদা কমে না, বরং আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে নারীদের প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।


প্রকাশিত: July 29, 2026 | সময়: 3:55 am | সুমন শেখ

আরও খবর