সর্বশেষ সংবাদ :

এখনো ২০ টাকা মাসিক বেতন! ‘লাশ কাটা ঘরের খোঁজ রাখে না কেউ’

সবুজ ইসলাম: “দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও আমাদের শ্রমের দাম বাড়েনি। আগে যখন আমাদের বাপ-দাদারা লাশ কাটতো তখন তারা ২০ টাকা বেতন পেত। তখন সেই ২০ টাকার কিন্ত দাম ছিল। কিন্তু এখন তো ২০ টাকা দিয়ে কিছুই হয়না। কিন্ত আমাদের বেতন এখনোও ২০ টাকাই থেকে গেছে। সরকার সব কিছুর খোঁজ নেয় কিন্তু, আমাদের এই লাশ কাটা ঘরের খোঁজ রাখে না কেউ।” কথা গুলো বলছিরেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মর্গের ডোম শুভ। দীর্ঘদিন থেকে মর্গ (লাশ কাটা ঘর) কাজ করলেও তারা নিয়মিত বেতন পান না বলে জানান। শুভসহ এই মর্গে কাজ করেন আরো ৭ জন। তাদের ভিতরে শুধুমাত্র একজন সরকারিভাবে নিয়োগ পেয়েছেন এবং একজন পেয়েছেন চুক্তিভিত্তিক। বাকি ৬ জন কাজ করেন বিনা পারিশ্রমিকে। তারা জানান, তাদের মানবেতর জীবনযাপন দেখার কেউ নেই।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে দিনের আলো যেমন ঢোকে, তেমনি ঢোকে মৃত্যুর গল্প। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা, আত্মহত্যা কিংবা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার মানুষের নিথর দেহ আসে এখানে। সেই দেহের রহস্য উন্মোচনের কাজে চিকিৎসকদের পাশে নীরবে কাজ করেন কয়েকজন মানুষ যাদের পরিচয় ‘ডোম’। সাধারণ মানুষের কাছে তারা পরিচিত লাশকাটা ডোম হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে এক গভীর বেদনা, সামাজিক অবহেলা আর বেতনহীন সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। মর্গের ভেতরে যখন একটি মৃতদেহের ময়নাতদন্ত চলে, তখন চিকিৎসকের নির্দেশে দেহ কাটা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করা, নমুনা সংগ্রহ এবং শেষে আবার সেলাই করে দেওয়ার মতো কঠিন কাজগুলো করেন তারাই। প্রতিদিন মৃত্যু,রক্ত,পচন আর স্বজনহারাদের কান্নার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। অথচ সমাজে তারা প্রায় অদৃশ্য মানুষ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মর্গে একমাত্র নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম শ্রী বিপনকুমার। ৫২ বছর থেকে তিনি এখানে কাজ করছেন এবং প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি লাশ কেটেছেন। তার এই পেশা শুরু হয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। তার দাদা এবং বাবার কাছে থেকে এভাবেই পেশাটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন মর্গের ভেতরের দৃশ্য। অন্য শিশু যখন স্কুল শেষে খেলাধুলা করে, তখন তিনি বাবার সঙ্গে মর্গে এসেছে, মৃতদেহ সেলাই করতে সাহায্য করেছে কিংবা ভয় কাটানোর জন্য ধীরে ধীরে এই পেশায় অভ্যস্ত হয়েছে। জানতে চাইলে শ্রী বিপনকুমার বলেন,“আমি এখানে দীর্ঘ ৫২ বছর থেকে কাজ করে আসছি এবং আগে বাবার সাথে থেকে কাজ দেখেছি। এই পর্যন্ত আমার হাতে ৪০ হাজারেরও বেশি লাশ কেটেছি। প্রথম দিকে ভয় লাগতো, কিন্তু এখন আর কিছু মনে হয়না। এটাই এখন পেশা হয়ে গেছে।”
সম্প্রতি তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবে তার এখানে (মর্গে) আরো ৭ জন ছেলে কাজ করে। তাদের ভিতরে মাত্র একজন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়েছে, বাকি ৬ জনের কোন নিয়োগ হয়নি। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা শোনান বেতনহীন লাশা কাটা ঘরের যন্ত্রণার কথা। রঞ্জন নামের এক ডোম আক্ষেপ নিয়ে বলেন,“এখানে ১০-১৫ বছর থেকে কাজ করছি। এখনো আমাদের কোন নিয়োগ হয়নি। আমরা বাইরে গেলে কোথাও কোন সম্মানও পাই না। এখন লাশ কাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই এখানে আসি। আমরা চাই আমরা যেন সরকারি ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হই।”
তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা সামাজিক বৈষম্যের শিকার। অনেক জায়গায় তাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খেতে চায় না কেউ কেউ। সন্তানদের স্কুলে অপমান সহ্য করতে হয়। বিয়ের ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। সমাজের প্রয়োজনীয় কিন্তু কঠিন কাজটি করার পরও তারা সম্মান পায় না। রিদয় নামের আরেক ডোম বলেন,“বাইরে গেলে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারি না। সমাজের লোক আমাদের ঘৃণা করে। কিন্তু এটাও তো আমাদের কাজ। সরকার যদি আমাদের এই পেশাটার দিকে নজর দিতো। আমরা যদি সরকার থেকে বেতন পেতাম তাহলে ভালো হতো।”
প্রতিটি লাশের পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি গল্প। মর্গের কর্মীরা জানান, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত হলো শিশু কিংবা তরুণ-তরুণীর লাশ ময়নাতদন্ত করা। অনেক সময় মায়ের আহাজারি, বাবার নিস্তব্ধ কান্না কিংবা স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ তাদের মনেও দাগ কেটে যায়। কাজের স্বার্থে তারা আবেগ চেপে রাখেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষ হিসেবেই কষ্ট অনুভব করেন। শ্রী বিপনকুমার বলেন,“আমাদেরও তো পরিবার আছে, ছেলে-মেয়ে আছে। লাশ কাটতে অনেক সময় খারাপ লাগে। আবার এটা না করেও তো কোন উপায় নাই। কষ্ট চেপে রেখেই আমাদের কাজ করতে হয়।” বাবু নামের এক কর্মী বলেন, “আমাদেরও তো সন্তান আছে। যখন কোনো ছোট বাচ্চার লাশ আসে, তখন নিজের সন্তানের মুখ ভেসে ওঠে। কিন্তু কষ্ট হলেও কাজ থামানো যায় না।”
দিন শেষে মর্গের দরজা বন্ধ হয়। স্বজনরা চলে যায়, চিকিৎসকেরাও নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরেন। কিন্তু দেয়ালের ভেতর জমে থাকে অসংখ্য মৃত্যুর স্মৃতি। সেই স্মৃতির মাঝেই নীরবে ঘরে ফেরেন মর্গের কর্মীরা। সমাজ তাদের চেনে লাশকাটা ডোম হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে তারা আসলে সংগ্রামী মানুষ যারা প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অন্যের জীবনের শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হন। তাদের হাতেই উন্মোচিত হয় বহু মৃত্যুর রহস্য, প্রতিষ্ঠিত হয় বিচার। কিন্তু তাদের একটাই দাবি, তারা যেন সামাজিক ভাবে মর্যাদা পান এবং তারা তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা পান।


প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬ | সময়: ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর