বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
নুরুজ্জামান, বাঘা :
টগবগ করে ফুটছে তেল। কড়াইয়ের ভেতর সোনালি রঙ ধারণ করছে পেঁয়াজু আর বেগুনি। সেই ফুটন্ত তেলের মাঝেই মুহূর্তের জন্য খালি হাত ডুবিয়ে একের পর এক ভাজা খাবার তুলে বিক্রি করছে এক কিশোর। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে বিস্ময়। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করছেন, আবার কেউবা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তবু দমেনা এই কিশোর। কারণ তেলের কড়াইয়ে তার জীবন চলে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমোদপুর গ্রামের এই কিশোরের নাম আব্দুল জাব্বার। পেঁয়াজু-বেগুনির দোকানেই চলছে পড়াশোনা ও সংসারের চাকা । গরম তেলের কড়াইয়ে হাত দেওয়ার অদ্ভুত দক্ষতা তাকে এলাকায় আলাদা পরিচিতি এনে দিলেও তার জীবনের গল্প কেবল বিস্ময়ের নয় ! এটি এক প্রকার সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
আমোদপুর গ্রামের জামে মসজিদ মোড়ে প্রতিদিন বিকেল গড়াতেই প্রাণ ফিরে পায় ছোট্ট একটি দোকান। সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের ভিড়ে জম-জমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে জাব্বার একদিকে পেঁয়াজু-বেগুনি ভাজে, অন্যদিকে সামলায় ক্রেতাদের চাহিদা । রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তার ব্যস্ততা। মাঝে মধ্যে সিদ্ধ ছোলা এবং ডিমও বিক্রি করে সে ।
এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে জাব্বার। বয়সে তরুণ হলেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে অনেক আগেই। বাবার ছোট্ট পেঁয়াজু-বেগুনির দোকান এখন তার হাতে। দোকানের আয় দিয়েই চলে সংসারের নিত্যদিনের খরচ, পাশা-পাশি মেটানো হয় তার লেখাপড়ার ব্যয়ও ।
স্থানীয়দের ভাষ্য , শুধু ব্যতিক্রমী দক্ষতার জন্য নয়, জাব্বারের তৈরি পেঁয়াজু ও বেগুনির স্বাদের কারণেও তার দোকানের আলাদা সুনাম রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার দোকানে আসেন। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে আসেন গরম তেলের কড়াইয়ে হাত দেওয়ার দৃশ্য দেখতে , আবার অনেকে ফিরে যান পেঁয়াজু-বেগুনির স্বাদের প্রশংসা করে।
পরিবারে চার বোনের পর একমাত্র ছেলে জাব্বার। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে সে বিশেষ আদরের। তবে আদরের আড়ালে রয়েছে কঠোর পরিশ্রমের বাস্তবতা। সেই পথচলায় পদ্মার আড়ালে বসে তাকে জোগাল দেন সহযোদ্ধা মা’ মুঞ্জুরা বেগম। প্রতিদিন বাড়িতে বসে তিনি পেঁয়াজ ও মরিচ কাটা , ময়দা প্রস্তুত করা, ছোলার ঘুগনি তৈরী,বেগুন কাটা-সহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। এ ছাড়াও দোকানে ক্রেতাদের সামলাতে জাব্বারের পাশে থাকেন তার প্রতিবেশী তিন বন্ধু- কিরন,তামিম আর আসিফ।
জাব্বারের বাবা বাবুল ইসলাম এলাকায় আরেক কারণে সুপরিচিত। প্রায় চার দশক ধরে তিনি গ্রামের মানুষের কবর খোঁড়ার কাজ করে আসছেন। গ্রামের কোথাও মৃত্যুর সংবাদ পেলেই ডাকের অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। মানবসেবার এই কাজকে তিনি দায়িত্ব হিসেবেই বেছে নিয়েছেন।
শুধু বাবুল ইসলাম নন , তার এই মানবিক উদ্যোগের সাথে বর্তমানে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের আরও সাত-আট জন তরুণ যুবক । বাশ কাটা ও রাত্রী কালিন সময়ে আলোর ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব কিছুই তারা করে থাকেন । বর্তমানে এই কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন জাব্বারও। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো , এই কাজের জন্য তারা কারও কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেন না । বরং প্রতি রমজান মাসে গ্রামের মসজিদে রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন করেন নিজেদের উদ্যোগে।
বাবুল ইসলাম বলেন, কবর খোঁড়া কাজটি ধর্মীয় অনুভতি থেকে আমাকে যুবক বয়সে অনুপ্রানিত করে। আমি যাদের কাছ থেকে এই কাজ শিখে ছিলাম, বর্তানে তাঁরা কেউই বেঁচে নেই । হয়তো আমিও এক সময় মারা যাবো । তাই তরুণ প্রজন্মকে এ কাজ শিখিয়ে যাচ্ছি, যেন আমার অবর্তমানে তারা এই সেবা মুলক কাজটি চালিয়ে যেতে পারে ।
এদিকে অত্র এলাকার সুশীল সমাজের লোকজন জানান, বর্তমানে সংসারের হাল ধরা , পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং সমাজসেবা মূলক কাজে যুক্ত থাকা-আব্দুল জাব্বারের জীবন এখন যেন , এক অনন্য উদাহরণ। গরম তেলের কড়াইয়ে হাত দেওয়া তার সাহসের পরিচয় হতে পারে , কিন্তু এর চেয়েও বড় পরিচয় হলো শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য মানসিকতা রয়েছে তার ভেতর।
আমোদপুর গ্রামের এই কিশোরকে নিয়ে তার চাচা শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, একদিকে জীবিকার সংগ্রাম, অন্যদিকে সমাজসেবার প্রতি দায়বদ্ধতা-এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আমোদপুর গ্রামের বাবুল ইসলাম ও তার ছেলে আব্দুল জাব্বারের অনন্য জীবনগাথা। গরম তেলের কড়াইয়ে হাত দেওয়া কিশোর জাব্বার যেন শুধু সাহসের নয়, সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ এবং স্বপ্ন জয়েরও এক উজ্জ্বল প্রতীক।
নুরুজ্জামান /শামি