সর্বশেষ সংবাদ :

ওষুধ কিনতেই অসহায় রোগি

সবুজ ইসলাম: “গরিব মানুষের দেখার কেউ নেই। আগে যে ওষুধ ৪৫ টাকায় কিনতাম, এখন ৬০ টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে যদি দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে তো আমাদের মরে যেতে হবে।” কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছেলে মাহিনের জন্য ওষুধ কিনতে আসা মহিমা বেগম।
নগরীর লক্ষীপুর মোড়ের ওল্ড রাজশাহী ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, চিকিৎসা ব্যয় এখন তাদের মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তারদের দেওয়া টেস্টের সাথে এখন যদি বাড়তি দামে আমাদের ওষুধও কিনতে হয় তাহলে তো আমাদের জন্য এ বিষয়টি অনেক কষ্টের। শুধু মহিমা বেগম নন, রাজশাহীর হাজারো রোগী ও স্বজন এখন ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ওষুধের দামও। ফলে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন ওষুধের দোকান, ফার্মেসি মালিক ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই বছরে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের দাম গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্য ও বাজারে বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। বিশেষ করে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। রোগীরা অভিযোগ করছেন, একই ওষুধ কয়েক মাস আগেও যে দামে কিনেছেন, এখন তার জন্য অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
পাশ্ববর্তী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন ডায়গনষ্টিক সেন্টার থাকায় নগরীর লক্ষীপুর মোড়েই রয়েছে অর্ধশতাধিক ওষুধের দোকান। এসব দোকানের বিক্রেতারা জানান, হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার কারণে কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। সেই সুযোগে অনেক ওষুধের দামও বেড়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত নাপা, সেকলো, অমিডন, মন্টেয়ার-মোনাস, এমকাস, রিভার্সএয়ারসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০ টাকার নাপা সিরাপ এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ৪৫ টাকার সেকলো ট্যাবলেটের পাতা কিনতে রোগীদের গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা।
সামনে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। আর এই রোগের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইনের বাজারেও এখনো স্বস্তি ফেরেনি। লক্ষীপুর এলাকার বিভিন্ন ফার্মেসি ঘুরে দেখা যায়, বেশি ব্যবহৃত ওষুধ গুলোর দাম কয়েক ধাপে বেড়েছে। যে ইকোস্প্রিনের পাতা আগে ৬ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ট্যাবলেটের দাম ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ পয়সা হলেও বাজারে পাতাপ্রতি আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। জ্বরের ওষুধ প্যারাসিটামল (নাপা) ট্যাবলেটের পাতা আগে বিক্রি হতো ৮ থেকে ১০ টাকায়, বর্তমানে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। এছাড়াও লোসারটান পটাশিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম: ৮ টাকা থেকে ১০-১৫ টাকা, প্যারাসিটামল ৬৬৫ মিলিগ্রাম: ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা, অ্যামলোডিপাইন-অ্যাটেনোলোল: ৬ টাকা থেকে ৮ টাকা, ব্রোমাজিপাম ৩ মিলিগ্রাম: ৫ টাকা থেকে ৭ টাকা, অ্যাসপিরিন ৭৫ মিলিগ্রাম: ৬.৪০ টাকা থেকে ৮ টাকা, মেট্রোনিডাজল ৪০০ মিলিগ্রাম: ১ টাকা থেকে ২ টাকা, মেট্রোনিডাজলের ১০ পিস স্ট্রিপ: ১৪.৬০ টাকা থেকে ৩০ টাকা, ফেক্সোফেনাডিন: ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা, অ্যাজিথ্রোমাইসিন: ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা, মন্টিলুকাস্ট: ১৬ টাকা থেকে ১৭.৫০ টাকা, ভিটামিন বি-১, বি-৬ ও বি-১২: ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা, ইসমিপ্রাজল: ৫ টাকা থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এসব ওষুধের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ফলে নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওষুধের বাড়তি ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবার এখন খাদ্য ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করাতে পারছেন না। নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার আরাফাত নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, “ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা আর ওষুধ সব মিলিয়ে চিকিৎসা করানো এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে সংসারের অন্য খরচ কমিয়ে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।” মোস্তাফিজ মামুন নামের আরেকজন বলেন,“জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম যদি বাড়তে থাকে তাহলে তো আমাদের মত নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য অনেক সমস্যা। বাড়তি দামে ওষুধ কেনা আমাদের পক্ষে তো সম্ভব না।
লক্ষীপুর মোড়ের মেসার্স ট্রপিক্যাল ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী শাহজাহান আলী বলেন, “কোম্পানি আমাদের যে রেট দিয়েছে, সে রেট অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে গত এক বছরে ওষুধের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।” ওল্ড রাজশাহী ফার্মেসির এক বিক্রয়কর্মী বলেন,“ওষুধের দাম বাড়ায় রোগীদের কষ্টের বিষয়টা সবাই দেখছে। কিন্তু আমাদেরও তো কিছু করার নেই। কোম্পানি যে দামে দেয়, আমরা সেই দাম অনুযায়ী বিক্রি করি। কোম্পানি দাম কমালে আমরাও কম দামে বিক্রি করব।”
ওষুদের দাম বাড়ার বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় ওষুধ প্রশাসন কার্যালয়ের উপপরিচালক সুর্কণ আহমেদ বলেন, “ওষুধের দাম যখন বাড়ানো হয়, তখন সারাদেশেই একই রেট নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত মূল্যের বাইরে দাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করছি। কোথাও বেশি দামে ওষুধ বিক্রির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬ | সময়: ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর