শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, পুঠিয়া: উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ আমের বাজার রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আম হাট পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ৯টার দিকে তিনি হাটে এসে বিভিন্ন আমের আড়ত, পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র ও দোকান ঘুরে দেখেন। এ সময় তার সঙ্গে দূতাবাসের রাজনৈতিক কাউন্সেলর এরিক গিলান, রাজনৈতিক কর্মকর্তা চার্লস বেসনার্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রদূত বিভিন্ন জাতের আম সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন এবং ব্যবসায়ী ও আমচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের আমের স্বাদ গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং রাজশাহীর আমের গুণগত মান ও বৈচিত্র্যের প্রশংসা করেন।
হাটে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই সফর রাজশাহীর আমকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও পরিচিত করে তুলবে। তারা মনে করেন, এমন সফর বিদেশি বাজারে রাজশাহীর আমের চাহিদা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় আমচাষিরাও সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রাজশাহীর আমের সুনাম ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি কূটনীতিকদের সরেজমিনে পরিদর্শন দেশের কৃষিপণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়াবে এবং রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, “রাষ্ট্রদূত হিসেবে এটি আমার প্রথম রাজশাহী সফর। ২০২০ সালে একবার এখানে এসেছিলাম, তবে এবার বিশেষভাবে আমের মৌসুমে এসেছি, কারণ আমি রাজশাহীর বিখ্যাত আমের স্বাদ নিতে চেয়েছিলাম। এখানে আসতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।”
তিনি বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল থেকে এসেছি। কোনো পণ্য যেখানে উৎপাদিত হয়, সেখানে গিয়ে সেটি দেখার অভিজ্ঞতার তুলনা নেই। উৎপাদনস্থলে সবচেয়ে তাজা, বৈচিত্রময় এবং উৎকৃষ্ট মানের পণ্য পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।”
আমের প্রতি আমেরিকানদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমেরিকানরা আম খুব পছন্দ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বেশিরভাগ সময় হিমায়িত আম পাওয়া যায়, যা শেক ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এখানকার মতো এত তাজা আম সেখানে সহজে পাওয়া যায় না।”
বাংলাদেশের আম রপ্তানির সম্ভাবনা আরও বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের কোল্ড চেইন বা শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, আধুনিক হিমাগার ও সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি পেলে হিমায়িত আম সারা বছর আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে বাংলাদেশের আম শিল্প আরও বিকশিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই সফরকে রাজশাহীর আম শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজশাহীর আমের পরিচিতি ও বাজার সম্প্রসারণে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, সফরকালে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর পুলিশ সুপার নাইমুল হাসান, লিয়াকত সালমান, পুঠিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান, বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আঃ রাজ্জাক দুলালসহ পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী পরিদর্শন করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। রাজবাড়ীর বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখে তিনি মুগ্ধতার কথা জানান। পাশাপাশি ঐতিহাসিক এই স্থাপনার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।
দুপুর সোয়া ২টার দিকে প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নিয়ে পুঠিয়া রাজবাড়ীতে পৌঁছন রাষ্ট্রদূত। এ সময় তিনি রাজবাড়ী প্রাঙ্গণে অবস্থিত জাদুঘর, রানীরঘাট, গোবিন্দ মন্দির, আন্নিক মন্দির, শিবমন্দিরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখেন। স্থাপনাগুলির নির্মাণশৈলী, ইতিহাস এবং সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘‘পুঠিয়া রাজবাড়ী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর আরও উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’’
রাষ্ট্রদূতের সফরকে ঘিরে রাজবাড়ী এলাকায় ছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্থানীয়দের অনেকেই তাঁকে এক নজর দেখতে ভিড় করেন। রাজবাড়ী ঘুরে দেখার সময় রাষ্ট্রদূতের মুখে ছিল উচ্ছ্বাসের ছাপ।