, , ।
গোবিপ্রবি প্রতিনিধি :
বছর ঘুরে আবারও মুসলিম উম্মাহর দ্বারে উপস্থিত পবিত্র ঈদুল আজহা—ত্যাগ, আনুগত্য ও মহান আত্মসমর্পণের এক অনন্য উৎসব। হিজরির দ্বিতীয় সালে (২ হিজরি) থেকে ঈদুল আজহার নামাজ ও কুরবানির বিধান চালু হয়। তবে এই ঈদ শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আত্মশুদ্ধির চিরন্তন শিক্ষা বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদ শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তোলে পরিবারে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শৈশবের স্মৃতিময় উষ্ণতা। ঈদুল আজহার ধর্মীয় তাৎপর্য, ত্যাগের শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি ও ব্যক্তিগত আবেগ–অনুভূতি নিয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন সানশাইনের এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মুছাদ্দিক।
‘মনের পশুত্ব দূর করুক ত্যাগের শিক্ষা’
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত আলম বলেন, “দেখতে দেখতে আবার চলে এলো সেই দিন। অন্য অনেক কিছুই থেমে থাকলেও ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না। সারাবছরের পথচলা ও পৃথিবীর বিরূপ বাস্তবতা আমাদের কঠোর করে তোলে। কিন্তু মনুষ্যত্ব, মমত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিকতা আছে বলেই আমরা মানুষ। আচরণে ও কাজে পশুত্ব কি আমাদের সঙ্গে মানায়?
পশু কোরবানির মাধ্যমে মনের পশুত্ব দূর করে সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের প্রেরণা দেয় ঈদুল আজহা। সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করেও পৃথিবীকে সুন্দরভাবে সাজানোর শিক্ষা পাই আমরা এই দিনে। এবারের ঈদ হোক মনের পশুত্ব মুছে মানবতার স্বার্থে ত্যাগের মানসিকতা তৈরির নতুন অভ্যুত্থান।”
‘কুরবানি শেখায় তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য’
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুরাইয়া বলেন, “কুরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আমাদের জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা। কুরবানির ইতিহাস আমাদের হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের আদর্শ মনে করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
আমি মনে করি, কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কেবল পশু কুরবানি নয়, আমাদের অহংকার, হিংসা ও খারাপ কাজগুলোও ত্যাগ করা জরুরি। পাশাপাশি কুরবানির মাংস সঠিকভাবে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের দায়িত্ব।”
‘ত্যাগ ও সহমর্মিতাই ঈদুল আজহার প্রকৃত সৌন্দর্য’
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসাইন্স বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাদ হাসান বলেন, “ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। আমার কাছে এটি শুধু আনন্দের উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধির অন্যতম সময়। পশু কুরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মধ্যে বিতরণের মধ্য দিয়ে সমাজে সমতা ও আন্তরিকতার এক অপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি হয়।
প্রতিটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মতো এই ঈদেও পরিবারের সবাই একত্রে আনন্দ উপভোগ করতে পারে, যা আমাদের মতো ঘর থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম প্রশান্তির বিষয়। আমি মনে করি, ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা যদি আমরা সারা বছর ধারণ করি, তাহলে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য আরও বৃদ্ধি পাবে।”
‘ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক’
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. এহসানুল হক রকি বলেন,
“ঈদ মানে আনন্দ, আর সেই আনন্দটাই যদি সবার মাঝে না থাকে, তাহলে ঈদের যথার্থতা কোথায়? ঈদের আনন্দ তখনই উপভোগ্য হয়ে ওঠে, যখন ঈদ হয় মানবিকতা ও ত্যাগের।
বর্তমান সমাজে আমাদের চারপাশে কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। তাঁদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই হলো প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরের তাকওয়া দেখেন। তাই ব্যক্তি স্বার্থকে পিছনে রেখে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলাই হোক আমাদের ঈদের মূল শিক্ষা।”
‘ত্যাগের চেতনায় গড়ে উঠুক মানবিক ও সচেতন সমাজ’
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসাইন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মোছা. তুহিনা খাতুন বলেন, “বছর ঘুরে ফিরে আসা পবিত্র ঈদুল আজহা কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর জীবনদর্শন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এই উৎসবের আবহে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আসলেই ঈদের মূল শিক্ষাটি নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারছি?
ঈদুল আজহার মূল বাণী হলো নিজের ভেতরের অহংকার ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দেওয়া। কিন্তু বর্তমান সমাজে ত্যাগের চেয়ে লৌকিকতা ও প্রদর্শনেচ্ছাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের প্রকৃত মানবিকতার চর্চা করা জরুরি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক মধ্যবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ তীব্র সংকটে আছেন। কুরবানির মাংস কেবল নিজের ফ্রিজে বন্দি না করে তাঁদের দুয়ারে সসম্মানে পৌঁছে দেওয়াই হলো আসল মানবিকতা। উৎসবের আনন্দ তখনই সার্থক হয়, যখন তা সবার মাঝে ভাগ করে নেওয়া যায়।”
তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পাসের তরুণ সমাজ হিসেবে আমাদের ভাবনায় কেবল সমাজ নয়, পরিবেশের সুরক্ষাও থাকা উচিত। কুরবানি-পরবর্তী সময়ে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও রক্ত ফেলে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দ্রুত সময়ে আশপাশ পরিষ্কার করা এবং ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করাও এক ধরনের দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের অংশ। শিক্ষাজীবনেও ঈদের এই ত্যাগের মহিমা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বন্ধুদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সহনশীলতার চর্চা করা এবং সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করার প্রত্যয় আমাদের নিতে হবে। গোবিপ্রবির শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের মেধা ও মনন যেন শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হোক।
কুরবানির রক্ত কিংবা মাংস আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও শুদ্ধতা। আসুন, পশুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরের সমস্ত হিংসা ও অহংকারকেও কুরবানি দিই। আমাদের ঈদ ভাবনা হোক আরও উদার ও মানবিক।”
মুছাদ্দিক/শামি