সর্বশেষ সংবাদ :

ধর্ষণে বাড়ছে উদ্বেগ পরিবারে

নুরুজ্জামান,বাঘা :
সম্প্রতি সারা দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা । প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে। এতে আতঙ্কিত অনেক পরিবার। ইতোমধ্যে ঢাকার পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধর্ষকের বিচারের দাবিতে ঝড় উঠেছে । অনেকেই সোচ্চার হয়ে মানববন্ধন ও মিছিল করেছেন।

মানবাধিকার সংস্থা, পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে এ ধরনের অপরাধ আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ সংযোগ ও শৃঙ্খলার কারণেই অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠন এইচ আরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মাসে দেশে ৫৮০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বেড়েছে।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশেরও বেশি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তাঁরা মন্তব্য করেন। অপরদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ধর্ষণের শিকার হন ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ও শিশু। ২০২০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২৫-এ, যা ছিল রেকর্ড সংখ্যক। ২০২১ সালেও ১ হাজার ৩২১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।

এদিক থেকে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮০টি ছিল গণধর্ষণ এবং অধিকাংশ ভুক্তভোগী শিশু ও কিশোরী। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে দেশে নথিভুক্ত ধর্ষণের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। শুধু ধর্ষণই নয়, ধর্ষণের পর হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নভেম্বর মাসে কেবল নারী ও শিশু-সহ ১৮১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন ধর্ষণের শিকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ঘটনায় দ্রুত বিচার না হওয়া এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে সমাজে ভয়ের পরিবর্তে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়ছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল কঠোর আইন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তারা।

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সামাজিক অবক্ষয়, অনলাইন অশ্লীলতা, মাদক বিস্তার, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলেই ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে। তারা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এ বিষয়ে বিচার-বিভাগ আরো ফার্স্ট হওয়া সহ আইনের পরিবর্ত দরকার বলেও তাঁরা মন্তব্য করেছেন।

বাঘার কয়েকজন শিক্ষক জানান, ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে জঘন্য আঘাত। প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এসব ঘটনা সমাজে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা কমছে না। তাঁরা আরো জানান, এ বিষয়ে সমাজে সম্মিলিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। নারীর প্রতি সম্মানবোধ, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

নুরুজ্জামান /শামি


প্রকাশিত: May 23, 2026 | সময়: 6:40 pm | Daily Sunshine