, , ।
সবুজ ইসলাম: মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ। কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রম শেষে ঘরে উঠছে নতুন ধান। কিন্তু সেই ধান হাটে বিক্রি করতে এসে চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে ধানের দাম না বাড়ায় লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। কৃষকদের অভিযোগ, সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি ধানের দাম। ফলে মৌসুম শেষে লাভ তো দূরের কথা, অনেকেই খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার ধানের হাট ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের ঘরে ধান উঠলেও মুখে নেই স্বস্তির হাসি। বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে। অনেক স্থানে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে ঋণ শোধ কিংবা সংসার চালাতে কম দামে ধান বিক্রি করছেন তারা।
সরেজমিনে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাট গাঙ্গোপাড়া এবং মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমণ জিরা ধান বিক্রি হচ্ছে ১৩২০ টাকা থেকে ১৩৬০ টাকা, ব্রি-আঠাশ বিক্রি হচ্ছে ১১২০ থেকে ১১৫০ টাকা, ব্রি-৭৫ বিক্রি হচ্ছে ১০৫০ থেকে ১১০০ টাকা, ১২৫০ থেকে ১৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কাটারি ধান। জানতে চাইলে কৃষকেরা জানিয়েছে ক্ষেত থেকে প্রকারভেদে এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। চলতি বছর সার-বিষের দাম বেড়ে যাওয়া এবং লোডশেডিং থাকায় ধান উৎপাদনে খরচ আরো বেড়েছে।
রাজশাহীর বাগমারা গাঙ্গোপাড়া হাটের ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন কৃষক আব্দুল হান্নান। জানতে চাইলে তিনি বলেন,“এক বিঘা জমিতে ধান করতে যে খরচ হয়েছে, সেই তুলনায় দাম খুবই কম। শ্রমিকের মজুরি, সারের দাম, ডিজেলের খরচ সব বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। ধান বিক্রি করে এখন লাভ তো দূরের কথা, ঋণই শোধ করতে পারছি না।”
কেশরহাটের কৃষক নুর ইসলাম বলেন,“ধানের বাজারে কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যখন ধান ওঠে তখন দাম কমে যায়। কয়েক মাস পর ব্যবসায়ীরা সেই ধান বেশি দামে বিক্রি করে। লাভটা সবসময় মধ্যস্বত্বভোগীরাই নেয়।”
আরেক কৃষক মমিন আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“আমরা শুধু কষ্টই করি। মাঠে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ধান ফলাই। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গেলে মনে হয় আমাদের পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই। এভাবে চললে কৃষক আর ধান চাষে টিকতে পারবে না।”
সাইফুল ইসলাম নামের এক ধানের আড়তদার বলেন,“গতবারের চেয়ে এইবার রাজশাহীতে আবহাওয়া ভালো। গতবার বৃষ্টির কারণে কৃষক ধান কাটতে পারেনি, এইবার বৃষ্টি নেই। এখন কেবলমাত্র হাটে ধান উঠা শুরু হয়েছে। সামনে সপ্তাহে থেকে ধানের দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে আমি মনে করছি।”
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন ধান বিক্রি করেও সেই ঋণ শোধ করতে পারছেন না। এতে নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষক পরিবারগুলোতে। কেউ কেউ ভবিষ্যতে ধান চাষ কমিয়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকার কথাও ভাবছেন।
আর সরকারি খাদ্যগুদামে সরকার ধান ক্রয় করলেও প্রশাসনিক জটিলতা, লেবার ও পরিবহন খরচ ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক কৃষকই ধান নিয়ে সরকারি খাদ্যগুদামে যায় না বলে জানান। ফলে কৃষকরা কোনো সুবিধা বা উপকার পান না। চাষিরা আরো জানান, চলতি মৌসুমে আলু চাষে ব্যাপক লোকসানের পর ধানেও ক্ষতির মুখে পড়ায় অনেক কৃষক চরম সংকটে পড়েছেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় ফসলের অবস্থা বেশ সন্তোষজনক। কৃষি বিভাগ এবার জেলায় মোট তিন লাখ ২৭ হাজার ৫৪৪ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন পাওয়া যাচ্ছে ৪ দশমিক ৭০ টন। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার মোট আবাদের প্রায় ৫৭ শতাংশ ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন হয়েছে
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি উপকরণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সেচে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের খরচ, শ্রমিক সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। অথচ বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল না থাকায় কৃষকেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) ড. মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন,“এবার ঝড় এবং শিলাবৃষ্টি না হওয়ায় ধানের আবাদ ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ছে। বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকেরা হতাশ। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরও বাড়ানো গেলে কৃষক কিছুটা লাভবান হতে পারেন।”