, , ।
সবুজ ইসলাম: হঠাৎ পূর্ববর্তী কোন ঘোষণা ছাড়াই জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। আর এই দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দেশে উৎপাদিত কাঁচামাল পরিবহণ খাতে। বিশেষ করে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের কাঁচামাল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকের ভাড়া হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। এতে করে পরিবহণ খরচ বেড়ে ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পাইকারী কাঁচা বাজারে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, ব্যবসায়ীরা মৌসুমি বিভিন্ন ধরণের সবজি ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন বিভিন্ন জায়গায় পরিবহণের জন্য প্রস্তত করছেন। এখান থেকে লাউ, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, পটল, টমেটো, শসাসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায় ট্রাকের মাধ্যমে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে আগে যেখানে একটি ট্রিপে ট্রাক ভাড়া পড়তো নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী, এখন সেই রুট ভেদে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাধ্য হয়েই তারা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
হাটের একাধিক কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, আগে রাজশাহী (নওহাটা) থেকে সিলেটগামী একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু গত দুইদিনের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ার কারণে সেই ভাড়া এখন হয়েছে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা। সিলেটগামী গাড়িতে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও একই স্থান থেকে ঢাকাগামী ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা, সেই ভাড়া বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা। রাজশাহী থেকে ঢাকা, কাওরান বাজার, মিরপুর, কামারপাড়া, সাভার, বাইপাইল, সখিপুর, কোনাবাড়ি, চৌরাস্তা, টাঙ্গাইলে তেল বৃদ্ধির প্রভাবে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে করে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
কাঁচামাল ব্যবসায়ী সোহাগ আলী বলেন,“হঠাৎ করেই সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এতে করে আমাদের মাল পাঠানোয় পরিবহণ খরচ বেড়ে গেছে। আগে যে খরচে মাল ঢাকায় পাঠাতে পারতাম, এখন তার থেকে অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। এতে করে লাভ তো কমছেই, অনেক সময় লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
ভুলু নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন,“এখন হাটে সবজির দাম কম। কিন্তু পরিবহণ খরচের কারণে সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে। আগে আমরা ঢাকায় একগাড়ি মাল পাঠাইতাম ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় এখন একই মাল পাঠাচ্ছি ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকায়। যা দুইদিন আগেও কম ছিল। এখন তেলের দাম বেড়েছে তাই ট্রাক মালিকরা ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
অন্যদিকে ট্রাকচালক ও পরিবহণ মালিকরা বলছেন, তাদেরও বিকল্প নেই। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মিঠন আলী নামের এক ট্রাকচালক বলেন,“তেলের জন্য গাড়ি চালানো এবং পণ্য পরিবহণে খুবই কষ্ট হচ্ছে। তেলের অভাবে নিয়মিত ট্রিপ নিয়ে যেতে পারছি না। আবার লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেলা পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে, তাই আমাদের সেনুযায়ী ভাড়াও বেড়েছে। তেলের দাম কমলে ভাড়াও কমবে।”
রাজশাহী জোসনা পরিবহণের মালিক মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন,“তেলের দাম বাড়লে গাড়ির ভাড়াও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। আমার গাড়িতে যদি তেল থাকে তাহলে আমি ভাড়া নিয়ে যাবো, না হলে গাড়ি বন্ধ থাকবে। পাম্পে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমার প্রয়োজন ১ হাজার লিটার তেল, সেখানে আমি পাচ্ছি ৩০০ লিটার। এভাবে কি গাড়ি চলবে? ডিজেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, আগের ভাড়ায় চলা সম্ভব না। খরচ তুলতেই ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে। তাই আমাদের সরকারের কাছে অনুরোধ অতিদ্রুত তেলের সংকট যাতে শেষ হয়।”
হাটের ইজারাদার আজাদ সরকার জানান, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব হাটেও পড়েছে। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় গাড়ি ভাড়া বেড়েছে। এতে করে হাটের ব্যবসায়ীদের দূর-দূরান্তে পণ্য পাঠাতে বেশি টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।’ অতিদ্রুত তেলের দাম এবং সরবরাহ নাগালের ভিতরে আসবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেছেন।
ইতোমধ্যে পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তার উপরও চাপ বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। পরিবহণ খরচ বেড়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।