সর্বশেষ সংবাদ :

বৈশাখে মাতাবে ঐতিহ্যবাহী ‘শখের হাঁড়ি’

সবুজ ইসলাম: বিদায় নিতে চলেছে বাংলা ১৪৩২ সাল। আর মাত্র কদিন পরেই নতুন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পুরানো বছরকে পেছনে ফেলে বাঙালি বরণ করবে নতুন বছর ১৪৩৩ সালকে। দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে সাবর্জনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ।
আর এই পহেলা বৈশাখ মাতাবে রাজশাহীর সুশান্ত পালের ঐতিহ্যবাহী ‘শখের হাড়ি’। বৈশাখ বরণে মাটির তৈরি হাঁড়িসহ ছোট বাচ্চাদের মাটির খেলনা তৈরীর অন্যতম কারিগর রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুরের মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল। পহেলা বৈশাখ দোরগোড়ায়। পালের বাড়ি এখন মাটির তৈরি হাঁড়ি, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, পুতুলসহ নানা পণ্যে ঠাসা। কোনোটি এখনো নরম কাদায় মাখানো। আবার কোনোটি রোদে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কোনোটিতে রং-তুলির আঁচড় দেওয়া হচ্ছে।
মাটির তৈরি বিভিন্ন আকারের হাঁড়িতে শৈল্পিক এমন কারুকার্য দেখে মন ছুঁয়ে যাবে যে কারও। প্রতিবছর বৈশাখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়াগায় বিপুল চাহিদা থাকে এই শখের হাঁড়ির। আসন্ন বৈশাখী মেলাকে ঘিরে বসন্তপুর গ্রামে শখের হাঁড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারুশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। দিন-রাত সমানতালে কাজ করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পালপাড়ায় ৭০ বছর বয়সী সুশান্ত এবং তার দুই ছেলে মাটির তৈরি নানান জিনিসপত্র তৈরি করছেন। এসব জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাদের তৈরি করা পণ্যের বেশির ভাগই গৃহস্থালি ও সাংসারিক সাজসজ্জার পণ্য। তারা মূলত দেশের বিভিন্ন মেলা উপলক্ষে তৈরী করে মাটি দিয়ে হাঁড়ি, ঘোড়া, কচ্ছপ, ছোট-বড় পুতুল, মাছ, সিংহ, হাতি, কবুতর, পেঁচা, বাঘ ইত্যাদি। এ পণ্যগুলো বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করেন তারা। ফলে আসন্ন বৈশাখী মেলাকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে।
কারিগররা জানান, বৈশাখ এলেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ। এতে কাজের চাপ বাড়ে। তবে বৈশাখ শেষ হলে আর কোনো বিশেষ চাহিদা থাকে না। শখের হাঁড়ির কারিগর মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল জানান, বৈশাখী মেলার আয়োজন নিয়ে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। সারা দেশ থেকে ক্রেতারা আসেন শখের হাঁড়ি কিনতে। ৪ পিসের শখের হাঁড়ি, ছোট পাতিল, সাজি, পঞ্চ সাজি, মাটির পুতুল, খেলনা এসব কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা।
কারিগর আনন্দ কুমার পাল বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি শখের হাঁড়ি। আগে অনেক পরিবারই এ কাজ করত। এখন কারিগরের সংখ্যা কমছে। শৌখিন মানুষের কাছে শখের হাঁড়ির চাহিদা আছে। তবে আগের মতো নেই।
দেশের সুনামধন্য কারিগর সুশান্ত কুমার পাল জায়গা করে নিয়েছেন চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে। সেখানে তার ছবিসহ গল্প রয়েছে। আর রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার। ঘুরে বেরিয়েছেন জাপান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে। সরেজমিনে সুশান্ত কুমার পালের বাড়িতে গিয়ে দেখা আরো দেখা যায়, বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে শখের হাঁড়ি তৈরিতে সবাই ব্যস্ত। কেউ মাটি তৈরি করছেন, কেউবা শখের হাঁড়ি তৈরি করছেন। আবার কেউ কেউ সেগুলোতে রং চড়াচ্ছেন। রং আর শখের হাঁড়িগুলো শুকানোর কাজে সুশান্তকে সহযোগিতা করেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও। এবার সুশান্ত পালের নাতী সনচিতা পাল (১৬) তিনিও হাতে কলমে রং করা শিখেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি সনচিতাও শখের হাড়ি বানানো শিখেছে।
সুশান্ত কুমারের পুত্রবধূ করুণা রানী পাল বলেন, ‘হাতে সময় নেই। ঢাকার দুই জায়গায় বৈশাখী মেলা উপলক্ষে অর্ডার আছে। তাই সাতসকালে কাজে বসেছি। দুপুর গড়িয়ে গেছে। তাও কাজ শেষ হয়নি। সেখানে সাজসজ্জা ছাড়াও অনেক কাজ রয়েছে। তাই বাড়ির সবাই শখের হাঁড়ি তৈরির কাজে লেগে গেছি। সকাল থেকে ১০০ সেট রং-তুলি শেষ করেছি। একেকটা সেটে চারটি করে শখের হাঁড়ি আছে। এর মধ্যে ৪ পিসের শখের হাঁড়ি, ছোট পাতিল, সাজি, পঞ্চ সাজি, মাটির পুতুল, খেলনা।
তিনি আরও বলেন, এ বছর ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা দামের শখের হাঁড়ি রয়েছে। এখানে দামটা বিষয় নয়, শখের হাঁড়ি রাজশাহীর ঐহিত্য। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি রাজশাহীর মানুষ তেমন চেনেন না। শখের হাঁড়িতে বিভিন্ন প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়। হাঁড়ির শরীরে লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি বা খয়েরি রঙে আঁকা থাকে পদ্ম, মাছ, ধানের ছড়া, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, সিঁদুরের কৌটা ইত্যাদি।
শখের হাঁড়ির কারিগর সুশান্ত কুমার পাল বলেন, ‘৪০ বছর ধরে ঢাকার বিসিকে মেলা করছি। এবারও যাব। সোনারগাঁও মেলায় যাওয়া-আসা আছে। সেখানে আমার দোকান আছে। বৈশাখে এবার দুটি জায়গায় মেলার আয়োজনে থাকবো।’ তিনি বলেন, ‘শুধু শখের হাঁড়ির কারণে আমার এত পরিচিতি। আমি দক্ষতা পুরস্কার পেয়েছি ১৮টি, শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছি ৪টি। এ ছাড়া গত বছর লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে আজীবন সম্মাননা পেয়েছি।’


প্রকাশিত: April 10, 2026 | সময়: 5:41 am | সুমন শেখ