সর্বশেষ সংবাদ :

উপজেলার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ ছিলেন তিনি : দড়ি-বাঁশ বেয়ে মসজিদে যাওয়া অন্ধ মুয়াজ্জিন রহমান আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার, বড়াইগ্রাম: দড়ি ও বাঁশ বেয়ে মসজিদে যাওয়া নাটোরের বড়াইগ্রামের ১২০ বছর বয়সী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেছেন। তিনি বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই স্ত্রী, ৯ মেয়ে ও ১০ ছেলে সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় বড়দেহা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানাজার নামাজ শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর জানাজার নামাজে বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিএনপি-জামায়াত সহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মী সহ বিপুল সংখ্যক মুসল্লী অংশ নেন। এই বর্ষীয়ান ধর্মপ্রাণ মানুষটিকে নিয়ে ২০২৪ সালের ১৩ মে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।
জানা যায়, প্রায় ২২ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। এর ছয় বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। এরপর দেশে ফিরে নিজ গ্রামে ৫ শতাংশ জমির ওপর তৈরি করেন একটি পাকা মসজিদ। মসজিদের নামেই তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি করে দেন। এরপর নিজেই সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কিন্তু চোখে দেখতে না পাওয়ায় জটিলতা দেখা দেয় মসজিদে আসা-যাওয়া নিয়ে। সেই প্রতিবন্ধকতাও জয় করে ফেলেন শতবর্ষী এই বৃদ্ধ। এজন্য সন্তানেরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত টেনে দেন দড়ি ও বাঁশ। এরপর দড়ি আর বাঁশের সাহায্যে নিয়মিত মসজিদে যেতেন তিনি।
আব্দুর রহমান মোল্লার ছেলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম সাইফুল জানান, হজ পালন করে আসার পর তার বাবা মসজিদ স্থাপন করে সেখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার। তখনই জটিলতা দেখা দেয় আসা-যাওয়া নিয়ে। সেই জটিলতাও নিরসনের পথ বাতলে নেন আব্দুর রহমান মোল্লা নিজেই। বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তায় দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দিতে বলেন।
বাবার দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দেন ছেলেরা। এরপর প্রথম দিকে কয়েকদিন তার ছেলে ও নাতিরা দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তাকে যাতায়াত ও রাস্তা পার হতে অভ্যস্ত করে তোলেন। এছাড়া বাঁশ ও দড়ি খুঁজে পেতে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি লাঠিও। এভাবে কয়েকদিন দেখিয়ে দেওয়ার পর আর কারও সাহায্য নিতে হয়নি শতবর্ষী এই বৃদ্ধকে। এরপর থেকে তিনি নিজেই দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে বাড়ি থেকে মসজিদে যেতেন।
তাঁর মৃত্যুতে নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ বলেন, বড়াইগ্রাম উপজেলার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ ছিলেন তিনি। দুই চোখ অন্ধ হওয়া স্বত্ত্বেও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের প্রচার-প্রসার সহ মানুষকে ধর্মের পথে আনতে তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা সত্যিই বিরল। তাঁর মৃত্যুতে সকলেই গভীরভাবে মর্মাহত। আমি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।


প্রকাশিত: April 7, 2026 | সময়: 3:18 am | সুমন শেখ

আরও খবর