সর্বশেষ সংবাদ :

ডিমের খোসার পাউডার মৎস্য ও প্রাণী খাদ্যে রাখছে অবদান

মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটে ডিমের ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে পাউডার। আর সেই পাউডার এখন সাড়া ফেলেছে জেলার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি স¤পদ খাতে। মাছ, মুরগি ও গরুর খাবারে এই পাউডার যেমন ক্যালসিয়াম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, তেমনি ফসলি জমিতে জৈবসার হিসেবেও কার্যকর প্রমাণ দিচ্ছে এই পাউডার। জেলার বিভিন্ন পোল্ট্রি হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করা খোসা প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিদিন বাজারজাত হচ্ছে জেলার বাইরেও। এতে বদলে গেছে এর উদ্যোক্তা বেলাল মোল্লার জীবন। একই সঙ্গে কৃষক ও মাছ চাষিদের জন্য খুলেছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জয়পুরহাট সদর উপজেলার বেলতলী গ্রামের বাসিন্দা বেলাল মোল্লা দীর্ঘদিন থেকে জেলার বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে পরিত্যক্ত ডিমের খোসা সংগ্রহ করতেন এবং তখন তিনি এসব খোসা বগুড়া সহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করতেন।
এক পর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, ওই খোসা গুঁড়ো করে আরও বেশি কাজে লাগানো যায়। আর ওই চিন্তা থেকেই গত ২০২৪ ডিসেম্বরে সালে নিজ উদ্যোগে স্থাপন করেন ছোট্ট একটি কারখানা। এখন সেখানে প্রতিদিন কয়েক টন খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে ডিমের খোসার পাউডার।
বর্তমানে জয়পুরহাট জেলা ছাড়াও এই পাউডার অন্ততঃ দেশের ১৫টি জেলায় নিয়মিত সরবরাহ করছেন তিনি। জানালেন, ৫০ কেজি ওজনের পাউডারের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকায়। সব খরচ বাদ দিয়েও বর্তমানে মাসে বেলাল মোল্লার আয় হচ্ছে লক্ষাধিক টাকা। স্থানীয় ৫ জন শ্রমিকও এই কারখানায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
উদ্যোক্তা বেলাল মোল্লা বললেন, ‘আগে শুধু খোসা সংগ্রহ করে বিক্রি করতাম। পরে জানতে পারি এই খোসা দিয়ে পাউডার তৈরি হয়। সেই ভাবনা থেকেই কারখানা শুরু করি। এখন জয়পুরহাট সহ দেশের ১৫ জেলায় সরবরাহ করছি উৎপাদিত এই পাউডার। প্রথম দিকে তেমন বিক্রি না হলেও বর্তমানে কৃষক ও মাছ চাষীদের কাছে এই পাউডারের চাহিদা ব্যাপক। এখন আমি চাহিদামতো পাউডার দিতেই পারছি না।’
পাউডার কারখানার শ্রমিক আব্দুল মোমিন বলেন, ‘ডিমের খোসা পরিষ্কার করে মেশিনে দিলে তা গুঁড়ো হয়ে পাউডার বেড় হয়। তারপর বস্তায় ভরে বাজারজাত করা হয়। এই কারখানা থেকে যে বেতন পাচ্ছি তা দিয়ে সংসার চলে ভালো ভাবেই।’
স্থানীয় কৃষক ও মাছ চাষিরাও এই পাউডারে প্রচুর উপকৃত হচ্ছেন। সদর উপজেলার জামালগঞ্জ এলাকার মাছ চাষি মাসুদ রানা বলেন, ‘এতদিন জানতাম ডিমের খোসা শুধু ফেলার জিনিস। এখন দেখছি এটা দিয়ে যে পাউডার হচ্ছে, তা মাছের খাবারে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম জোগাচ্ছে। আবার অনেকে এটা ফসলি জমিতেও ব্যবহার করছে।’
বেলতলী গ্রামের কৃষক আকরাম হোসেন বলেন, চলতি বছরে এই পাউডার জমিতে ব্যবহার করে এলাকার শতাধিক কৃষক ব্যাপক ভাবে উপকৃত হয়েছেন। গত বছরের চেয়ে এ বছর তাদের ফসলের ফলন বেশ ভাল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ডিমের খোসা দিয়ে পাউডার তৈরির মতো উদ্যোগ শুধু কর্মসংস্থানই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখছে।’ একই গ্রামের মাছচাষি ইমরান হোসেন বলেন, ‘আমি এখান থেকে পাউডার কিনে খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে মাছকে খাইয়েছি। দেখছি, মাছ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বড় হচ্ছে।’
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোল্ট্রি শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাট সদর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট পোল্ট্রি মানিক হোসেন বললেন, মুরগীর বাচ্চা ফোটার পরপরই ওইসব ডিমের খোসা ফেলে দেওয়া হয়। এরপর খোসার পরিমান বেশি হলে তা ট্রাকে করে দুরে কোথাও নদীতে কিংবা পরিত্যক্ত কোন স্থান বা ভাগাড়ে ফেলতে হতো। এতে আমাদের ট্রাক ভাড়া খরচ হতো। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছর থেকে বেলাল মোল্লা ডিমের পরিত্যক্ত খোসা নিয়ে যাওয়ায় এলাকার প্রায় দুই শতাধিক খামারী এই খরচ থেকে রক্ষা পেয়েছি।
জয়পুরহাট সদর উপজেলা প্রাণি স¤পদ কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এলাকায় প্রচুর ডিমের খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো। এখন বেলাল মোল্লা সেটাকে কাজে লাগাচ্ছেন।
ডিমের খোসায় ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাংগানিজ, বোরন, জিংক সহ নানা উপাদান রয়েছে। এগুলো মৎস্য, পোল্ট্রি আর কৃষিজমির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ডিমের ফেলে দেওয়া খোসা বেলাল মোল্লা নিজ থেকেই নিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন এলাকার পরিবেশ দূষণ কমছে, তেমনি অপরদিকে খোসা থেকে উৎপাদিত পাউডার ব্যবহারে পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্যে মিনারেলের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। আগে এসব উপাদান বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন উৎপাদন বাড়ার ফলে আমদানি কমে আসবে।


প্রকাশিত: January 24, 2026 | সময়: 7:04 am | সুমন শেখ