সর্বশেষ সংবাদ :

গ্যাস সংকট কাটাতে কদর বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার

ইবতিদা ফেরদৌস :

ভর্তুকিহীন এলপিজি গ্যাসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। রান্নার খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে ঝুঁকে পড়ছেন কারেন্টের চুলা বা ইনডাকশন চুলার দিকে। ফলে রাজশাহীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চুলার বাজার প্রায় স্থবির হয়ে পড়লেও চাহিদা বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার।

রান্নাঘরের সরঞ্জাম বিক্রেতারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ইলেকট্রিক চুলা ও ইনডাকশন কুকারের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো বা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রাইস কুকার, কারি কুকার ও প্রেসার কুকার মেরামতে ভিড় জমাচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা।

রাজশাহী নগরীতে ২০১৫ সালের জুনে সর্বশেষ আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পর থেকে পুরো শহরটি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের ফলে চাহিদা বাড়লেও চলতি জানুয়ারিতে গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

সরেজমিনে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সাহেব বাজার ও নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক সপ্তাহে গ্যাসের চুলার বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। সাহেব বাজারের রাজশাহী ক্রোকারিজ হাউজ এর স্বত্বাধিকারী আলহাজ্ব মো. মতিউর রহমান বাজারের বর্তমান মন্দা দশা নিয়ে বলেন, গত কয়েক বছরে গ্যাসের চুলার বাজারে এমন ধস আগে দেখিনি। আগে বিয়ের সিজন বা শীতে দিনে ৮-১০টা চুলা বিক্রি হতো, এখন গত তিন দিনে মাত্র একটা সিঙ্গেল বার্নার চুলা বিক্রি করেছি।

একই এলাকার মা ইলেকট্রনিক্সের কর্মচারী সইবুর জানান, গ্যাসের দাম বাজেটের বাইরে চলে যাওয়ায় ক্রেতারা এখন দোকানে এসে শুধু কারেন্টের চুলার খোঁজ নিচ্ছেন। এতে গ্যাসের চুলার বিক্রি কমে গেলেও বাড়ছে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বেচাকেনা।

কারেন্টের চুলার বিক্রি জনিত বিষয়ে লাবনী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকার মো হাসিবুল ইসলামের মতে, তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার চুলা গুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে এবং এর সাথে চাহিদা অনুযায়ী আনুষাঙ্গিক এক থেকে দুই হাজার টাকার স্টিকি বা নন স্টিকি ফ্রাইপ্যান ও করায় গুলো ক্রেতারা বেশি খুঁজছেন।

তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার পর থেকেই বাজারে কারেন্টের চুলার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে । পূর্বের তুলনায় ৩ থেকে ৫ টা কারেন্টের চুলা ও নন স্টিকি ফ্রাইপ্যান বেশি বিক্রি হচ্ছে।

সাহেব বাজারে চুলা কিনতে আসা গৃহিণী আকলিমা আক্তার বলেন, গ্যাসের যে দাম ! এর চেয়ে কারেন্টের চুলায় রান্না করা বেশি সাশ্রয়ী তাই বাজারে একটি চুলা দেখতে এসেছি।

বেসরকারি চাকরিজীবী আমজাদ হোসেন শিমুল বলেন, গ্যাস নেই বা দাম খুব বেশি। বিদ্যুৎ বিলও বাড়ছে। তবু আপাতত বিদ্যুৎ ছাড়া উপায় নেই।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মানুষ ইলেকট্রিক চুলার খোঁজ নিলেও বিদ্যুৎ বিলের আশঙ্কায় অনেকেই দোটানায় আছেন। সাহেব বাজারের বিক্রেতা কামরুল হাসান জানান, ইলেকট্রিক চুলার খোঁজ বাড়লেও দাম ও বিদ্যুৎ বিলের কথা ভেবে অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে এই সুযোগে ব্যস্ততা বেড়েছে মেকানিক পট্টিতে।

সাহেব বাজার মাস্টারপাড়া ইলেকট্রনিক্সের মেকানিক মাহবুবুর রহমান জানান, আগে দিনে ২-১টা চুলা আসত, এখন ১০-১৫ জন ক্রেতা সারাক্ষণ লাইন দিয়ে থাকছেন। মানুষ নতুন চুলা কেনার বদলে স্টোরে পড়ে থাকা বহু বছর আগের পুরনো বা জং ধরা চুলাগুলোও ঠিক করতে নিয়ে আসছেন।

নষ্ট কারেন্টের চুলা ঠিক করতে আসা স্কুল শিক্ষক আতিকুর রহমান বলেন, বেতনের টাকা দিয়ে চড়া দামে গ্যাস কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই নতুন চুলা না কিনে বাসায় পড়ে থাকা পুরনো নষ্ট ইনডাকশন চুলাটি ঠিক করতে এনেছি।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। রাজশাহীর ব্যস্ততম মনি চত্বরের ভাজাপোড়া ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, গ্যাসের চড়া দাম দিতে গেলেই লাভের টাকা শেষ। তেলের দাম ও বেসনের দাম আগে থেকেই চড়া ছিল। বাধ্য হয়ে সিঙ্গাড়া-সমুচার দাম বা আকার পরিবর্তন করতে হচ্ছে, কিন্তু তাতে ক্রেতা কমে যাওয়ার ভয় থাকে।

রাজশাহী এলপিজি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন জানান, নগরীতে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার সিলিন্ডার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনাসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি গত সপ্তাহে সীমিত সরবরাহ দিলেও এখন রেশনিং শুরু করেছে, কেউ কেউ দৈনিক সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’

সানশাইন /শাহজাদা


প্রকাশিত: January 21, 2026 | সময়: 6:57 pm | Daily Sunshine

আরও খবর