, , ।
ফুসফুস ক্যান্সার হলো ফুসফুসের কোষসমূহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে সৃষ্ট একটি প্রাণঘাতী রোগ। সাধারণত এটি ফুসফুসের টিস্যুতে শুরু হয় এবং সময়ের সাথে শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে, যাকে মেটাস্টাসিস বলা হয়। ফুসফুসের কোষ থেকে যে ক্যান্সার উৎপত্তি লাভ করে তাকেই ফুসফুস ক্যান্সার বলা হয়। অন্য কোনো অঙ্গ থেকে ক্যান্সার যখন ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে ফুসফুস ক্যান্সার না বলে ‘সেকেন্ডারি ক্যান্সার’ বলা হয়।
বর্তমানে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় এক কোটি মানুষ এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরিসংখ্যানে ফুসফুস ক্যান্সার শীর্ষে অবস্থান করছে। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যান। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারই ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এদের প্রায় অর্ধেকই মৃত্যুবরণ করেন।
পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারের হার সবচেয়ে বেশি। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সকল ধরনের ক্যান্সারের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে নারীদের মধ্যেও এই রোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো নারীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বৃদ্ধি। নারীদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সার বর্তমানে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে, যা সকল ক্যান্সারের মধ্যে ৬.৬ শতাংশ।
ফুসফুস ক্যান্সার প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে—স্মল সেল লাং ক্যান্সার এবং নন-স্মল সেল লাং ক্যান্সার। এই রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ধূমপান প্রথমেই উল্লেখযোগ্য। সিগারেট, বিড়ি বা তামাকজাত দ্রব্যে থাকা প্রায় ৬০টির বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করলে ফুসফুসের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। ধূমপান না করলেও যারা নিয়মিত ধূমপায়ীদের আশেপাশে থাকেন, তারাও পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকেন।
এছাড়া বায়ু দূষণ, বিশেষত বিষাক্ত গ্যাস ও ধূলিকণার কারণে ফুসফুসে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টস, আর্সেনিক, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শও এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পারিবারিক ইতিহাস, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসজনিত রোগ (যেমন: সিওপিডি বা ব্রংকাইটিস) এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনও ঝুঁকির অন্যতম উৎস। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব এবং দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস এই রোগের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে, যেমন: দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত বা রক্তমিশ্রিত কফ বের হওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকের মাঝখানে বা পাশে ব্যথা। রোগের পরবর্তী পর্যায়ে ওজন হ্রাস, দুর্বলতা, শ্বাস-প্রশ্বাসে শব্দ হওয়া, পিঠ বা হাড়ে ব্যথা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো গলা বা মুখ ফোলা কিংবা ঘন ঘন ফুসফুস সংক্রমণও দেখা দেয়।
ফুসফুস ক্যান্সার সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথমেই রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, পিইটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মাধ্যমে ফুসফুস ও শরীরের অন্যান্য অংশে ক্যান্সারের উপস্থিতি যাচাই করা হয়। এছাড়া কফ পরীক্ষা, বায়োপসি ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। কখনো কখনো জিনগত পরীক্ষা করে ঊএঋজ, অখক, কজঅঝ প্রোটিন বা জিন মিউটেশন শনাক্ত করা হয়, যা চিকিৎসার পরিকল্পনায় সহায়ক হয়।
চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের ধরন, অবস্থান ও রোগীর শারীরিক সক্ষমতার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার ধরা পড়লে অপারেশনের মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়। উন্নত পর্যায়ে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা আরামদায়ক চিকিৎসা উন্নত পর্যায়ের রোগীদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করে।
ফুসফুস ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ধূমপান পরিহার করা। ধূমপায়ী ব্যক্তিদের ধীরে ধীরে এই অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকেও নিজেকে নিরাপদ রাখা জরুরি। পাশাপাশি দূষণপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে থাকা, পেশাগত ঝুঁকি এড়ানো এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মানসিক চাপ কমানোও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তথ্য প্রচার ও শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হেলথ সেমিনার, পোস্টার-লিফলেট বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার এবং স্কুল-কলেজসহ স্থানীয় নেতৃত্বের অংশগ্রহণে ক্যাম্পেইন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যারা ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করাও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও টিকা গ্রহণ, যেমন ফ্লু ও নিউমোনিয়া প্রতিরোধক টিকা নেওয়াও সহায়ক হতে পারে।
ফুসফুস ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা। নিজেকে সচেতন করুন, পরিবারের সদস্য ও সমাজকে সচেতন করুন। কারণ একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হয়তো আপনাকে কিংবা আপনার প্রিয়জনকে একটি দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন উপহার দিতে পারে।
অধ্যাপক ডা. মো. দায়েম উদ্দিন
এফসিপিএস, এফআরসিপি, পিএইচডি
সিনিয়র কনসালটেন্ট
ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ
ডেল্টা হাসপাতাল লিমিটেড, মিরপুর, ঢাকা