সর্বশেষ সংবাদ :

ইসরায়েলকে ইউরোপীয় ফুটবল থেকে নিষিদ্ধের দাবি ৭০ ক্রীড়াবিদের

স্পোর্টস ডেস্ক: ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার কাছে দেশটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন ৭০ জনের বেশি ক্রীড়াবিদ। মঙ্গলবার উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিনের কাছে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে ‘অ্যাথলেটস ফর পিস’ ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন যৌথভাবে এই দাবি তোলে।
চিঠিটি লিখেছে ‘গেম ওভার ইসরায়েল’ নামে একটি সংগঠন। এতে বলা হয়েছে, ‘যে রাষ্ট্র গণহত্যা, বর্ণবৈষম্য ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে, তাকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে জায়গা দেওয়া মানেই নৈতিক দায় এড়ানো।’ চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধ করে চলেছে কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই দণ্ডমুক্তি চলতেই থাকবে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে তাদের প্রবেশ বন্ধ করাই একমাত্র নৈতিক পথ।’
এই আহ্বানে সই করেছেন ফরাসি বিশ্বকাপজয়ী পল পগবা, ডাচ ফরোয়ার্ড আনোয়ার এল গাজি, মরক্কোর হাকিম জিয়েখ এবং স্প্যানিশ উইঙ্গার আদামা ত্রাওরে। মানবাধিকার সংগঠন ‘হিন্দ রাজাব ফাউন্ডেশন’ ও ‘গাজা ট্রাইব্যুনাল’-ও চিঠিতে যুক্ত হয়েছে। এটি আসলে উয়েফাকে উদ্দেশ্য করে চলমান প্রচারণারই ধারাবাহিকতা; যেখানে দাবি করা হচ্ছে, গাজায় নৃশংস হামলার কারণে ইসরায়েলকে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে।
গত সেপ্টেম্বরে তুরস্ক ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইব্রাহিম হাজিওসমানোগলুও একই আহ্বান জানিয়েছিলেন। আইরিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রস্তাব পাস করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছিল, ইসরায়েল এখনো গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিক্ষিপ্তভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা ও বহু মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এখন পর্যন্ত ৬৯,১৮২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪২১ জন ফুটবলারও রয়েছেন।
গাজায় ফুটবলের অবকাঠামো (স্টেডিয়াম ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র) সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে দখলদারিত্ব আরও মজবুত করছে ইসরায়েল, যা আন্তর্জাতিক আদালতের ভাষায় ‘বর্ণবৈষম্যের সমতুল্য অপরাধ’। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ইসরায়েল ফুটবলকে ব্যবহার করছে দখলনীতি বৈধতা দিতে। অবৈধ বসতিগুলোর ক্লাবগুলোকে জাতীয় লিগে অংশ নিতে দিচ্ছে দেশটি, যা ফিফার নিয়মের সরাসরি লঙ্ঘন।
‘অবৈধ দখলকৃত এলাকার দলগুলোকে জাতীয় লিগে খেলার সুযোগ দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী,’ উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। ‘উয়েফা যদি ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে অর্থায়ন ও অংশগ্রহণের সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে তারাও এই অপরাধে সহায়তার দায় এড়াতে পারবে না।’
ইসরায়েলি ক্লাবগুলোর ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বছর আমস্টারডামে আয়াক্স ও মাকাবি তেলআবিব সমর্থকদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষে ‘আরবদের হত্যা করো’ স্লোগান শোনা যায়। ট্যাক্সিচালকদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং ঘরবাড়ি থেকে ফিলিস্তিনি পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়।
এই সহিংসতার পর চলতি মৌসুমে ইউরোপা লিগে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে মাকাবি তেলআবিবের সমর্থকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইংল্যান্ডের পুলিশ। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘এই সিদ্ধান্তটি আগের সহিংস ঘটনা ও ঘৃণামূলক অপরাধের প্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে।’
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকার দ্রুতই পুলিশি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, যা মানবাধিকার কর্মীদের তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। স্টারমার বলেন, ‘আমরা রাস্তায় কোনোভাবেই ইহুদি বিদ্বেষ বরদাশত করব না। পুলিশের দায়িত্ব হলো সব দর্শক যেন নিরাপদে ফুটবল উপভোগ করতে পারে।’ অবশেষে মাকাবি তেলআবিব ২-০ গোলে হার মানে অ্যাস্টন ভিলার কাছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রকে ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা নতুন কিছু নয়।’ উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন, যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানি, যুগোস্লাভিয়া ও সাম্প্রতিক রাশিয়া নিষেধাজ্ঞার দৃষ্টান্ত। চিঠির শেষাংশে বলা হয়, ‘আমরা আপনাদের আহ্বান জানাই, আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিক দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ইসরায়েলকে অবিলম্বে স্থগিত করুন।’


প্রকাশিত: November 13, 2025 | সময়: 5:06 am | সুমন শেখ