, , ।
মিজানুর রহমান, চারঘাট: রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলায় অনলাইন জুয়ায় আসক্তি ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। লোভনীয় বিজ্ঞাপনে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অল্প পুঁজিতে কয়েকগুণ লাভ মুহূর্তেই হওয়া যাবে লাখপতি। লোভ ও খপ্পরে অনেকেই জুয়ার টাকা সংগ্রহে জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডেও। অনলাইন জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে হতাশায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। সচেতনতা মূলক প্রচারণার পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার সাইটের পিছনে থাকা রাঘব বোয়ালদের আইনের আওতায় আনার দাবি স্থানীয়দের।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, অনলাইন এসব জুয়ার পেছনে তদারকির জন্য রয়েছে স্থানীয় একাধিক এজেন্ট। যারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার গ্রাহকদের কথিত আইডি তৈরি করে দেওয়ার নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। একজন গ্রাহক নিজের আইডি চালু করার পর অন্য কাউকে আইডি চালু করাতে পারলে পাচ্ছেন বাড়তি বোনাস। এসব কথিত বোনাস ও রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ভুয়া স্বপ্নে প্রতারকদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন উঠতি বয়সের তরুণÑতরুণী।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে জুয়ার মাধ্যমে কথিত উপার্জিত টাকা দেশের অনুমোদিত কোনো ব্যাংকেই লেনদেন সম্ভব নয়। যে কারণে স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমেই কথিত জুয়ার টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। ভিপিএন সফটওয়্যার ব্যবহার করে রাতভর মোবাইলে চলছে রমরমা জুয়ার আসর। যে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কোনো কুলকিনারা করতে পারছে না।
অনলাইন জুয়ায় আসক্ত উপজেলার কালুহাটি গ্রামের জীবন জানায়, ভেবেছিলাম অনলাইনে জুয়া খেলে কপাল বুঝি খুলে গেছে। অনলাইন জুয়া খেলে দিনে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় করতে শুরু করেছিলেন তিনি। একজন বেকারের জন্য যা বিশাল অঙ্ক। প্রথম দিকে সাফল্য ধরা দিলেও পরে তিনি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের থেকে টাকা ধার নিয়ে বেশী লাভের আশায় বিনিয়োগ করেন বেটিং সাইটে।
এক পর্যায়ে বেটিং সাইটে কয়েক লক্ষ টাকা খোয়া গেলে হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার মিথ্যা আশায় তিনি খেলা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষ টাকা খোয়া যায় তাঁর।
এদিকে ধারের টাকা শোধ করতে না পারায় ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে পরিবার ও তাঁর ওপর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের পক্ষ থেকে ধারের টাকা শোধ করার জন্য চাপ আসতে থাকে।
তিনি বলেন, একদিকে ধারের টাকা শোধের চাপ অন্যদিকে টাকা হারানোর হতাশায় জীবন এখন দুর্বিসহ। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। তিনি আরো জানান, গ্রামে তার মতো অনলাইন বেটিং সাইটে আসক্ত এমন আরও অনেক তরুণ-তরুণী রয়েছে। বেশীরভাগ তরুণরাই আমার মতো এখন অনলাইন বাজির নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
অনলাইন জুয়ায় আসক্ত উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামের জাবেদ আলী বলেন, জুয়া মানেই প্রতারণা। জেনে বুঝেই সাময়িক লাভের নেশায় প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়েছি। চোখের সামনে অনেক জনকে নিঃস্ব হতে দেখেও সেই ভুলটাই আমি নিজে করেছি।
এনজিও থেকে তিন লক্ষ টাকা লোন নিয়ে সমস্ত টাকা অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে দিশেহারা আমি। কিস্তির টাকা কিভাবে শোধ করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। কিস্তির টাকার জন্য আমি এখন প্রায় ঘর-বাড়ি ছাড়া বললেই চলে।
অনুপমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, তরুণ প্রজন্মকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ছোবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে প্রশাসনকে সোচ্চার হতে হবে। অবিভাবক সহ সবার এসব বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে চারঘাট মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মিজনুর রহমান বলেন, অনলাইন জুয়া ঘরে বসেই খেলা যায়। ফলে অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে হলে পারিবারিক ও সামজিকভাবে প্রতিরোধ ছাড়া পুলিশের একার পক্ষে বন্ধ করা কঠিন বলে জানান তিনি।