, , ।
সবুজ ইসলাম: ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজশাহী ও এর আশেপাশের অঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। নগরীর লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা এক হাজার ২০০ হলেও এখানে রোগি ভর্তি থাকে কয়েকগুণ বেশি। ৫৭টি ওয়ার্ডে রাজশাহী বিভাগের বাইরের জেলাগুলো থেকেও চিকিৎসা সেবা নিতে আসে কয়েক হাজার মানুষ। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি রোগি ভর্তি থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থসেবীদের। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক স্বল্প জনবল।
রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ নতুন রোগি। ওয়ার্ডে একজন ডাক্তার গড়ে রোগি দেখেন ৫০ জনের বেশি এবং একজন নার্স সেবা দেয় গড়ে ২০ জনকে। যেখানে চিকিৎসা সেবার নিয়ম রয়েছে একজন ডাক্তার সব্বোর্চ ১০ জন রোগিকে এবং নার্স ৬ জনকে। আর বর্হিবিভাগে একজন ডাক্তার চিকিৎসা দেন প্রায় ১০০ জনের অধিক রোগিকে। ১ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে এখানে প্রতিদিন গড়ে চিকিৎসা নেন ১০ হাজার রোগি। ফলে এতসংখ্যক রোগির চাপ সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
গত বুধবার সরেজমিনে হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, বাড়তি রোগি ভর্তি থাকায় হাসপাতালের বেড়ে জায়গা না পেয়ে মেঝেতেও শুয়ে অনেক রোগি চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। ওয়ার্ডের দুই বেড়ের মাঝে এবং সামনের সারিতে নিচে পাটি, শপ, চাঁদর বিছিয়ে চলছে চিকিৎসা। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন সাইদুল আলী নামের এক ব্যাক্তি। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা আজকেই এখানে ভর্তি হয়েছি। এখনো বেড পায়নি সেজন্য নিচে থেকেই চিকিৎসা চলছে। দুএকদিন গেলে, বেড ফাঁকা হলে তারপরে আমরা বেডে উঠবো।”
মরিয়ম নামের একজন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর মত টাকা পয়সা আমাদের নেই। তাই কষ্ট করে হলেও আমাদের এভাবেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে হবে। তবে আমি মনে করি এই হাসপাতালে যদি বেড বাড়ানো যায় এবং ডাক্তার নার্সের সংখ্য বৃদ্ধি পায় তাহলে আমাদের চিকিৎসা আরো উন্নত হবে। তারপরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ আমাদের সাধ্যমত ভালো চিকিৎসা দেওয়ার জন্য।”
শুধু এই চিত্র হাসপাতালে ৭ নম্বর ওয়ার্ডেই না। শিশু, সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি সহ বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও বাড়তি রোগি ভর্তি রয়েছে। যার ফলে ডাক্তারদেরও চিকিৎসা প্রদান করতে হচ্ছে নানা সমস্যা। বেশি রোগির সেবার জন্য হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়তি জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নার্স বলেন, “আমরা এত সংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দিতে কি পরিমাণ যে কষ্ট করি তা কেউ বোঝে না। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সব্বোর্চ চেষ্ট করি ভালো সেবা দেয়ার জন্য। আমাদের হাসপাতাল এক হাজার ২০০ শয্যার, কিন্ত এখানে ভর্তি থাকে ৪ থেকে ৫ হাজারের বেশি রোগি। বেশি রোগি ভর্তি থাকলে বেশি নার্স, ডাক্তার প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বেশি ডাক্তার, নার্স দেওয়া হচ্ছে না। আমরা চাই আমাদের হাসপাতালে ডাক্তার নার্সের সংখ্যা বাড়ানো হোক। এটি আমাদের সকলের দাবি।”
রামেক কর্তৃপক্ষ মনে করছে ভালো চিকিৎসা প্রদানে আরো ৫০ জন চিকিৎসক, ২০০ জন নার্সসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, এতো রোগিকে চিকিৎসা দিতে যে লোকবল প্রয়োজন আমাদের হাসপাতালে কিন্তু সেই পরিমাণ লোকবল আছে। বাড়তি রোগির জন্য বাড়তি লোকজন নেই। বিভিন্ন সময়ে আমাদের হাসপাতালের পরিচালক মহোদয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আমরা লোকবল বাড়ানোর জন্য চিঠি দিয়েছি। কিন্তু জনবল তো বাড়েনি কিন্তু একই সময়ে আমাদের হাসপাতালে রোগির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ শো শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন রোগি থাকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ রোগির মত। এই বাড়তি রোগির যে সেবা, সেই সেবা দিতে গিয়ে আমাদের হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সও ও অন্যান্য যে স্বাস্থ্যকর্মীরা রয়েছে তাদের কিন্তু নাভিশ্বাস অবস্থা। সংযত কারণেই রোগির সেবার মান ব্যহত হচ্ছে এবং হাসপাতালে পরিবেশ থেকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যহৃত হচ্ছে। আমাদের চাহিদা রয়েছে আউটডোরে (বর্হিবিভাগ) আরো ৫০ জন চিকিৎসক এবং ওয়ার্ডে বিভিন্ন অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক পদগুলো পূরণ করতে হবে এবং হাসপাতালে আরো ২০০ জন নার্স প্রয়োজন। এছাড়াও রাজশাহীতে আরো যেসকল সরকারি হাসপাতাল রয়েছে সেগুলো চালু করলে আমাদের হাসপাতালে রোগির চাপ কমবে এবং চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধি পাবে বলে আমি মনে করি।”