সর্বশেষ সংবাদ :

বিশ্ব ঐতিহ্য পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার: অবকাঠামো সংকটে পর্যটকদের ভোগান্তি

রানা হামিদ, বদলগাছী :

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে। তবে পর্যটন অবকাঠামোর ঘাটতি, আবাসন সংকট, গাইডের অভাব ও মানসম্মত রেস্টুরেন্ট না থাকায় দেশি-বিদেশি ভ্রমণকারীরা বারবার ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

 

 

ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দাপ্তরিক তথ্যমতে, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে বর্তমানে অফিসিয়ালি কর্মরত আছেন ১৮ জন এবং মাস্টাররোলে আছেন আরও ২৭ জন। মোট জনবল প্রায় ৪৫ জন। তবে দর্শনার্থীদের সেবা ও কার্যক্রমের তুলনায় এ জনবল যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

 

শুধু সাধারণ পর্যটক নন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরাও গবেষণা কাজে এসে সংকটের সম্মুখীন হন। সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকসহ পাহাড়পুরে গবেষণার কাজে ভ্রমণে আসেন।

 

শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা তুলে ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহাগ আলী বলেন, “আমরা ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এসেছি। ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতে আসা হলে আমাদের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় কাজ করতে হয়। আর কাজ করে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। কিন্তু যদি এখানে(পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে) পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে শিক্ষার্থীদের এতো কষ্ট পেতে হতো না। অবাক করা বিষয় হলো এতোবড়ো একটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের পাশে কোন আবাসনের ব্যবস্থা নাই। যাতে করে অনেক টুরিস্ট তাদের ভ্রমন সংক্ষিপ্ত করেই এখান থেকে চলে যায়।”

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আরিফুল ইসলাম জানান, “আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, পরিবেশ ভালো কিন্তু যদি একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য ব্যবস্থা থাকতো তাহলে খুবই ভালো হতো। সবাই যাতে এ ধরণের সুবিধা সহজেই পায় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।”

 

অফিসিয়াল গাইড না থাকা, মানসম্মত খাবার দোকানের অপ্রতুলতা, লকার রুম না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। আবার প্রত্ন নিদর্শন অনুযায়ী জাদুঘরের আয়তন ছোট হওয়ায় অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শনের বদলে স্টোরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে যাতে দর্শনার্থীরা হচ্ছেন বঞ্চিত।

 

বৌদ্ধবিহার থেকে স্থানীয়দের হোমস্টে’র উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হলেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি বলে জানান দায়িত্বরত কাস্টোডিয়ান। যদিও এই সচেতনতা কার্যক্রমগুলোর বয়সও প্রায় ৩ বছরের বেশি।

 

পাহাড়পুর সবচেয়ে বেশি ব্র্যান্ড ইমেজের সংকটে পরে বিদেশী পর্যটকদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে না পারায়। যদিও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাজ পর্যটকদের আবাসন তৈরী না হলেও এ খাতকে প্রভাবিত করছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল বা গেস্টহাউস না থাকার ঘাটতি।

স্থানীয়রা মনে করেন, সরকার ও পর্যটন কর্পোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পাহাড়পুরকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।

দর্শনার্থী আরমান হোসেন বলেন, “যদি পর্যটকরা এখানে থাকার মতো সুবিধা পেতেন, তাহলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হতো। এক্ষেত্রে শুধু সরকার বা পর্যটন কর্তৃপক্ষই নয়, এ অঞ্চলের নামি এনজিও গুলোও আবাসন/হোটেল তৈরীতে ভূমিকা রাখতে পারে। যাতে তাদের অর্থনৈতিক লাভ তো আছেই সাথে সামাজিক উন্নয়নও হবে। আমি মনে করি, অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নত করা গেলে পাহাড়পুর থেকে দেশের পর্যটন খাতে বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।”

 

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টোডিয়ান মুহাম্মদ ফজলুল করিম বলেন, “বর্তমানে চারটি রেস্ট হাউজ ভবনে মোট ১৫টি কক্ষ রয়েছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন দর্শনার্থী এখানে আসেন। ছুটির দিনে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০০ থেকে ১০০০ জনে। এখানে অফিসিয়ালি কোনো বুকিং সিস্টেম নেই। কেবল রেফারেন্স ও কঠোর আইডি যাচাইয়ের মাধ্যমে রুম বরাদ্দ দিতে হয়। ফলে অনেক দর্শনার্থী বাধ্য হয়ে জয়পুরহাট শহরে অবস্থান করেন।”

রানা হামিদ /শামি


প্রকাশিত: August 25, 2025 | সময়: 3:26 pm | Daily Sunshine