, , ।
ববি প্রতিনিধি :
এক বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছিল। কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবি থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র ও নাগরিক নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এক বছর পেরিয়ে এসে, আজ ২০২৫ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে আমরা ফিরে তাকাই সেই প্রতিরোধ, প্রতিবাদ আর স্বপ্নের দিকে। কতটা বদলেছে বাস্তবতা? কতটা পূরণ হয়েছে প্রত্যাশা?
” যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে শহীদরা জীবন দিল,তাদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মানের কাজটা আমরা খুব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে পারিনি ”
– সুজয় শুভ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই আন্দোলন এর অন্যতম সমন্বয়ক সুজয় শুভ বলেন,এ জাতি আদিকাল থেকেই বৈষম্য এর বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছে,যেমনটা ১৯৭১ এ পাকিস্তানি নিপীড়ন এর বিরুদ্ধে এ জাতি লড়াই করেছে, স্বৈরাচার এরশাদ এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তেমনটা ফ্যাসিস্ট হাসিনার সতেরো বছরের নিপীড়ন এর বিরুদ্ধে ও লড়াই করেছে।ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার সতেরো বছরে জনগণের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার ও নাগরিকের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বসেছিল,তার বিরুদ্ধে জনগণের স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনই আমার কাছে জুলাই অভ্যুত্থান। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সমস্ত প্রত্যশা পূরণ হবে এমনটা না কিছু হবে কিছু হবে না।
দুঃখজনক বিষয় হলো এই জুলাই অভ্যুত্থানে সমস্ত শ্রেণী-পেশার, ধর্ম,বর্ণ, লিঙ্গের মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো তাই প্রত্যাশাও বেশি ছিলো। তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন না দেখে অন্যান্য অনেকের মতো আমি নিজেও ব্যথিত।বৈষম্য বিরোধী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথটা একাগ্রতার সঙ্গে পাড়ি দিতে পারলাম না। শহীদদের স্বপ্নের যে বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে শহীদরা জীবন দিলো, তাদের সেই বাংলাদেশ বিনির্মানের কাজটা আমরা খুব সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে করতে পারিনি।
” যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চায়”
– সাজ্জাদ হোসেন
জুলাইয়ের আন্দোলনের সম্মুখ যোদ্ধা সাজ্জাদ হোসেন বলেন,আমরা যারা গত বছর জুলাই আন্দোলনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছিলাম, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসিত দেশ গড়া। দেশের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সকল নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম ছিল একটি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, আমাদের আত্মত্যাগ একটি নতুন ভোরের সূচনা করবে, যেখানে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নাগরিক আইনের শাসনের সুফল ভোগ করবে।আজ স্বাধীনতার এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমরা এখনও সেই দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখতে পাইনি, যা আমরা সেদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি—সর্বত্রই যেন সেই পুরনো জীর্ণতা এখনও বিদ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব, প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখনও আমাদের হতাশ করে। দেশের আনাচে-কানাচে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগার কথা থাকলেও, তার গতি অত্যন্ত শ্লথ।
আমরা জানি, পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। কিন্তু আমরা এইটুকু বলতে চাই, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, এবং দেশের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এগুলো কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং আমাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আমাদের রক্তে ভেজা স্লোগানকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
দেশের প্রতিটি সেক্টরে, বিশেষ করে শিক্ষা খাতে, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমরা দেখতে চাই, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে এসেছে, এখানে মেধা ও যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সবকিছুতেই যেন একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং তার দ্রুত বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়।
আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যদি আন্তরিকভাবে সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করে, তাহলে খুব দ্রুতই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা আবারও দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। আমরা শুধু দেখতে চাই, আমাদের আন্দোলন বৃথা যায়নি।
” এটি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনের ফলে জমা হওয়া একটি গণ বিস্ফোরণ ”
– মোকাব্বেল শেখ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সংগঠক ও জুলাই আহত মোকাব্বেল শেখ বলেন,সফল জুলাই অভ্যুত্থান কোন পরিকল্পিত বিপ্লব নয়।এটি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে জমা হওয়া একটি গণ বিস্ফোরণ। আমাদের প্রত্যাশা ছিলো বাংলাদেশ একটি কাঠামোগত স্থায়ী পরিবর্তন আসবে।যেটা স্বাধীনতার পর কখনোই আসেনাই।কিন্তু বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের আশানুরূপ পরিবর্তন কোথাও হয়নি।
পূর্বের মতোই অব্যবস্থাপনা, বৈষম্য আর দুর্নীতি অনেকাংশে রয়ে গেছে।আমি আশা করি জুলাইয়ের মাধ্যমে যে বিপ্লবের সুত্রপাত হয়েছে। সেটা এদেশের মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির মাধ্যমে অনাগত দিনে আমাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ তৈরি করবে এবং সহস্র শহীদদের অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার প্রাপ্তি অচিরেই অর্জিত হবে।
” আমার মাথায়, হাতে ও বুকে ৫১ টা স্প্রিন্টার লাগে ”
– হাসনাত আবুল আলা
অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হাসনাত আবুল আলা বলেন, জুলাই বিপ্লব ছিল স্বাধীকার ফিরে পাবার আপোসহীন সংগ্রাম। ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যাস্থার বিরুদ্ধে মুক্তিকামি সমাজের এক ইস্পাতসম দৃঢ় প্রতিরোধ। “বৈষম্য বিরোধী ছাত্রআন্দোলন” প্লাটফর্মের আওতায় সর্বস্তরের ছাত্রজনতার এক মহা বিপ্লব।
কোটার অযৌক্তিক ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন করতে চায় স্বৈরাচারী সরকার। যেভাবে শোষন করে আসছে দীর্ঘ ১৬/১৭ বছর শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী মত দমনে।
যেখানে মানুষের কোন অধিকার ছিল না, বাক স্বাধীনতা ছিল না, ছিল না জীবনের নিরাপত্তা। প্রতিবাদী কন্ঠকে স্তব্দ করেতে চালাতো নির্যাতনের স্ট্রিম রুলার। নির্বিচারে মানুষকে হওয়া লাগতো গুম, খুন, হত্যা ও নানান ষড়যন্ত্রের শিকার। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণাময় শাসণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোবের সৃষ্টিকারে। যার ফুসে উঠে দৃশ্যমান হয় জুলাই বিপ্লবে।
জুলাইয়ের প্রতিটি দিন এক একটি বিভীষিকাময় করুণ ইতিহাস। শত ভয়ের মাঝেও প্রতিরোধী আন্দোলনে পিছিয়ে নেই ছাত্রজনতা। প্রতিদিন চলছে যৌথবাহিনির সাথে জনতার এক অসম লড়াই। যেখানে নিপিড়ক যৌত বাহিনীর হাতে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, প্রোটেকশন গার্ড, আরও আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জা। বিপরীতে ইট পাথর আর লাঠি হাতে দাড়িয়ে যাওয়া বিপ্লবী তরুণ জোয়ানরা, যাদের অস্ত্র শুধু দেশপ্রেম,অসীম সাহস, অন্যায়ের প্রতিবাদী হিম্মত।
১৬ জুলাই আবুসাঈদ,শান্ত,ওয়াসিমসহ ৬জন ভাই নির্মমভাবে শহীদ হওয়ার ঘটনা প্রতিটি বিবেকবান হৃদয়ে বেদনার রেশ কেটেছে। রাস্তায় নেমে পড়েছে সর্বস্তরের জনসাধারণ। এবার এই আন্দোলন কোটায় থেমে নেই, রূপ নিল স্বৈরাচার পতনের সংগ্রামে। যার দরুন ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভিত কেঁপে উঠল।
৪ই আগস্ট বরিশাল হাতেম আলী কলেজের সামনে পুলিশের স্পিন্টারগুলোতে আমি আহত হই। আমার মাথায়, বুকে, হাতে, ও চোখে ৫১ টা স্প্রিন্টার লাগে। আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় একদিনে বসায় চলে আসি। ৫ই আগষ্ট আওয়ামী মসনদ ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো। আমরা পেয়েছি স্বাধীনতার স্বাদ নেয়ার সুযোগ।
যে প্রত্যাশা নিয়ে সর্বস্তরের জনসাধারণ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, শহীদরা অকাতরে বিলিয়ে দিল প্রাণ। আহত যুদ্ধরা চোখ হাত পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করল। রক্ত ঝরানো, অশ্রু জড়ানো, স্বজনহারা মর্ম বেদনারপ্রতি আমাদের যে দায়িত্ববোধ আমরা কতটুকু পালন করছি।
দুঃখের বিষয় জুলাই বিপ্লবের এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো জুলাই ঘোষণা পত্র ও সনদ মেলেনি। মিলেনি গণহত্যার দায়ে আওয়ামী স্বৈরাচারদের বিচারের দৃশ্যমান কার্যক্রম। এখনো জুলাই যোদ্ধাদের উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা পুনর্বাসন ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মাঝে। এখনো নির্বিচারে মানুষ খুন হয়, অনিয়মের শিকার হয়ে দুর্বলকে ভুক্তভুগি হওয়া লাগে। দূর্নীতি,চাঁদাবাজি,দখলদারিত্ব মানুষকে অতিষ্ঠ করে রাখছে। এই হতাশার বিষয়গুলো আমাদের খুব বিচলিত করে।
অসংখ্য অসংগতির মাঝেও আমরা প্রত্যাশা রাখি একটা সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। যেখানে সকলে অধিকার ফিরে পাবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরস্পরের বোঝাপড়া থাকবে। স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকবে।সর্বোপরি জুলাই শহীদদের চেতনা রক্ষিত থাকবে।আমাদের মাতৃভূমি থাকবে শান্তিতে ।
জুলাই আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়—এটি ছিল একটি জাতির অধিকার, আত্মমর্যাদার পুনর্জাগরণ। এখনও সব দাবি আদায় হয়নি, কিন্তু যা জন্ম নিয়েছে তা হলো প্রতিরোধের ভাষা। ভবিষ্যত হয়তো আরও কঠিন, কিন্তু এই যাত্রা থেমে যাবে না।
তপু /শামি