সর্বশেষ সংবাদ :

উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় জাল টাকা ও চোর সিন্ডিকেট

মাহফুজুর রহমান প্রিন্স ও ওমর ফারুক: ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় জাল টাকা চক্র ও চোর সিন্ডিকেটের তৎপরতা বাড়ছে। রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে জাল টাকা উদ্ধার ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। হাটবাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়া, মোটরসাইকেল ও ভ্যান চুরি, দোকানে চুরির ঘটনা বেড়েছে। ফলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (২১ মার্চ) রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ হাটে আনসার সদস্যরা এক ব্যক্তিকে জাল টাকাসহ আটক করেছে। আটক হামিদুল (৪০), বগুড়ার আদমদীঘি থানার বামনগ্রামের বাসিন্দা। তার কাছ থেকে এক হাজার টাকার একটি জাল নোট উদ্ধার করা হয়। হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগেও একই ব্যক্তি জাল টাকা দিয়ে প্রতারণার চেষ্টা করেছিল।
ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঈদের মৌসুমে এমন চক্রগুলো বিশেষভাবে সক্রিয় হয়। বিশেষ করে গরু, ছাগল ও পোশাকের বাজারে তারা জাল টাকা ছড়িয়ে দেয়। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার রেলস্টেশন এলাকায় মিনহাজুল ইসলাম (২৩) নামে এক যুবককে বুধবার জাল টাকা সহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে দুটি এক হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছে। আত্রাই উপজেলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইউনুস আলী জানান, মঙ্গলবার আত্রাই উপজেলার রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় একটি ফলের দোকানে আপেল ক্রয় করে একটি এক হাজার টাকার নোট বের করে দেয় মিনহাজুল। এসময় দোকানাদার টাকা হাতে নিয়ে জাল টাকা বলে স্থানীয় লোকজনকে জানায়। পরে লোকজন আসলে মিনহাজুলের শরীর তল্লাশী করে আরো একটি এক হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করে।
রংপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন বাজার ও আবাসিক এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে চুরির ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার এক দোকানদার জানান, সম্প্রতি তার দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে দিনাজপুরের বিরামপুরে দুইটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এবার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জাল টাকা চক্র। ফেসবুক, টিকটক ও টেলিগ্রামে ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘জাল টাকার ডিলার’সহ একাধিক পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার জাল নোট বিক্রি হচ্ছে। মাত্র ১০ হাজার টাকায় ১ লাখ টাকার জাল নোট সরবরাহ করা হচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। প্রথম ধাপে ৩-৫ হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করলেই হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বগুড়ার মহাস্থান হাট, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ হাট, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী বাজার, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা হাট এবং ঠাকুরগাঁওয়ের রানীসংকৈল বাজারেও জাল টাকা শনাক্তের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, বড় নোটের পাশাপাশি এবার ছোট নোটও নকল করা হচ্ছে, কারণ বড় নোট সাধারণত যাচাই করা হয়, কিন্তু ছোট নোট বেশি যাচাই করা হয় না। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি ১০০ পিস ১ হাজার টাকার জাল নোট (১ লাখ টাকা) তৈরি করতে চক্রের খরচ হয় মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা। পরে পাইকারি ক্রেতারা তা ৮-১৫ হাজার টাকায় কিনে নেয়। এর পরপরই প্রথম খুচরা ক্রেতা তা ২৫-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে এবং দ্বিতীয় খুচরা ক্রেতা আরও বেশি দামে বিক্রি করে। এই পদ্ধতিতে বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে আসল অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এমনকি, মাদকের লেনদেন, চোরাই পণ্য বিক্রি ও স্বর্ণের কেনাবেচাতেও জাল টাকা ব্যবহৃত হচ্ছে।
উত্তরের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ জাল টাকা চক্র ও চোরচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঈদের মৌসুম এলেই জাল টাকা ও চোরচক্র সক্রিয় হয়। এবারও তাদের ধরতে একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জাল নোট তৈরি ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযানও চালানো হচ্ছে। এছাড়া সার্বক্ষণিক অনলাইন তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপগুলোতে নজরদারি করা হচ্ছে। ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা জাল টাকা সংক্রান্ত তথ্য থাকলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে।


প্রকাশিত: March 22, 2025 | সময়: 3:05 am | সুমন শেখ