, , ।
সবুজ ইসলাম: রাজশাহীতে দিন দিন বাড়ছে গো-খাদ্যের দাম। ভুসি, খৈল, ধানের কুঁড়া, খড় ও গো-খাদ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানির ফিডসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন জেলার গবাদিপশুর খামারিরা। গত এক বছরে খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও পশু লালন-পালনের অন্যান্য খরচ। অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি দুধ ও গরুর বিক্রয়মূল্য। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। অনেকেই লোকসানের আশঙ্কায় খামার পরিচালনা করতে গিয়ে ঋণ ও সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছেন।
খামারিদের দাবি, গো-খাদ্যের দাম দফায় দফায় বাড়লেও বাজারে এর যৌক্তিক কারণ স্পষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদনকারী মিল ও কোম্পানির মালিকদের একাংশের পাশাপাশি একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেও দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ তাঁদের। অন্যদিকে, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে গবাদিপশু পালন ও বাজারজাতকরণে। এতে ভবিষ্যতে দুধ ও গরুর দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার খামারি আলতাফ হোসেন বলেন, “দফায় দফায় গো-খাদ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু দুধের দাম সেভাবে বাড়েনি। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরিও অনেক বেড়েছে। সব খরচ সামলে খামার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সমস্যার মধ্যেও এখনো টিকে আছি, কিন্তু আর কত দিন টিকে থাকতে পারব, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।”
চারঘাটের শিমুলিয়া এলাকার গরু খামারি বাবু হোসেন বলেন,“আগে আমার খামের ১০০ টিরও বেশি ছাগল ছিল। কিন্তু খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আমার খামারে ৫৮ টি ছাগল আছে। এত দামে খাবার কিনে খামার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমি আস্তে আস্তে খামার গুটিয়ে নিচ্ছি।”
পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকার কমেলা এগ্রো ফার্মের আশিকুর রহমান বলেন, “গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে গিয়ে খামারিরা লাভবান হতে পারছেন না। বর্তমান বাজারে প্রায় সব জিনিসের দাম বেশি। উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে আয় বাড়ছে না। এভাবে খামার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে।”
খামারিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের ব্যবধানে গো-খাদ্যের বিভিন্ন উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে ৩৭ কেজির এক বস্তা গমের ভুসি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। গত বছর এর দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ টাকা। ৭৪ কেজির এক বস্তা খৈলের দাম এখন ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। গত বছর এর দাম ছিল ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৫০ কেজি ধানের কুঁড়া কিনতে হচ্ছে ৮০০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৬৫০ টাকা। ১ হাজার পিস খড়ের বর্তমান বাজার মূল্যে ৮ হাজার টাকা যা কিছুদিন আগেও ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়।
এ ছাড়া প্রতি কেজি বুটের দাম ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকা, খেসারির দাম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, ভুট্টার দাম ২৭ টাকা থেকে বেড়ে ৩৬ টাকা এবং খুদের দাম ২৮ টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দামও ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। খামারিদের ভাষ্য, গবাদিপশুর খাদ্যতালিকায় এসব উপকরণ নিয়মিত রাখতে হয়। ফলে প্রতিদিনই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাঁদের। ছোট খামারিদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনার ব্যয় আরও বেড়েছে। খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর আগে একজন শ্রমিকের মাসিক বেতন ছিল ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে ১৫ হাজার টাকার কম বেতনে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, পশুর পরিচর্যা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়। অনেক খামারি ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
পবা উপজেলার নওহাটা পিল্লাপাড়া এলাকার গরুর খামারি সাবিনা খাতুন বলেন, “প্রতি বছর নিজের বাড়িতে তিন-চারটি গরু পালন করি। কিন্তু গো-খাদ্যের দাম এত বেড়েছে যে এখন আর আগের মতো লাভ হয় না। খাদ্য কেনার খরচ ও গরু লালন-পালনের পরিশ্রমের মূল্য হিসাব করলে লাভ থাকে না। তারপরও বাড়ির কাজের পাশাপাশি গরু পালন করছি। এটা এখন এক ধরনের শখ ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সারা বছর ভুসি-খৈল কিনে যে টাকা খরচ করি, বছর শেষে গরু বিক্রি করে সেই টাকা একবারে হাতে পেলে অনেক উপকার হয়। কিন্তু এবার লাভ তো দূরের কথা, এনজিওর সুদ পরিশোধ করে আসল পুঁজি ফেরত পাব কি না, তা নিয়েই আশঙ্কায় আছি।”
খরচ কমানোর বিকল্প উপায় ‘ঘাস চাষ’
গো-খাদ্যের বাড়তি দামের মধ্যে খামারিদের উৎপাদন খরচ কমাতে উন্নত জাতের ঘাস চাষের পরামর্শ দিয়েছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, শুধু ভুসি, খৈল ও খড়ের মতো বাজারনির্ভর খাদ্যের ওপর নির্ভর না করে পরিকল্পিতভাবে ঘাস উৎপাদন করতে পারলে খাদ্য ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আ. লতিফ বলেন, “প্রকৃত খামারিদের গো-খাদ্যের চাহিদা মেটাতে উন্নত জাতের ঘাসের আবাদ করতে হবে। এতে গো-খাদ্যের খরচ বেশ কমে যাবে। পাশাপাশি ঘাস গরুর স্বাস্থ্যের জন্যও খুব উপকারী।” তিনি বলেন, “যেসব খামারি শুধু ভুসি, খৈল ও খড়ের মতো গো-খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য এবার গরু পালন করে লাভবান হওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হবে। তাই আমরা খামারিদের উন্নত জাতের ঘাস চাষের পরামর্শ দিচ্ছি।”
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৬ হাজার ২৩৪টি গবাদিপশুর খামার রয়েছে। এর মধ্যে দেড় শতাধিক বড় খামার রয়েছে। এসব খামারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন বহু খামারি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।
রাজশাহী জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা আতোয়ার রহমান বলেন,“গো-খাদ্যের উর্দ্ধমুর্খী দামে খামারিদের আমরা ঘাস চাষেই বেশি পরামর্শ দিয়ে থাকি। তার কারণ হচ্ছে গবাদি পশুর জন্য ঘাসে সব ধরণের প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। আমরা সবাইকে বিনামূল্যে ঘাসের চারাও দিয়ে থাকি।”