সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
আসাদুজ্জামান মিঠু: রাজশাহী অঞ্চলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে ন্যায দাম না পেয়ে নাজেহাল অবস্থায় রয়েছে কৃষকেরা। গত বছর থেকে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত প্রধান ফসল ধানসহ আম, পেঁয়াজ, রসূন ও আলুর মত কৃষি পণ্যের ন্যায দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে করে কৃষক লোকসানের বোঝা ভারি হচ্ছে। অনেক কৃষকের ব্যাংক ঋনে সুদের হার বেড়েছে। অনেকের শেষ পুজিঁটা হারিয়ে ফেলেছে।
রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে বোরো ধান ও আমের ভরা মৌসুম চলছে। ঘরে নতুন ধান উঠছে গাছে গাছে ঝুলছে আম। তবু হাসি নাই কৃষকের। কারণ এক বছরের মধ্যে বাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌচ্ছে ধানের দাম। বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতিমণ(৪০) কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে। যা উৎপাদন খরচ উঠানো নিয়ে দুশ্চিতায় কৃষক।
এদিকে এবার আমের ভরা মৌসুমে দাম না পেয়ে গাছে গাছে পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আম। রাজশাহীঞ্চলে আমে বড় বাজার আমের ধস নেমেছে। ন্যায মূল্য না পাওয়া আম চাষীদের এবার বড় লোকসানে মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
বড় লোকসান শুধু ধান ও আমেই নয়, গত এক বছর যাবত আলু, পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করে উৎপাদন খরচ তো দুরের কথা অনেক কৃষক আসল পুঁিজ হারিয়ে ফেলেছেন।
কৃষকেরা বলছেন, দেশে নতুন সরকার এসে বড় বাজেট দিয়েছে তাতে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আমাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্য ন্যায মূল্য পেলেই আমরা খুশি।
স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরা বলছেন, জুন মাস ব্যাংক ক্লোলজিং তাই চাউল-মিল মালিকেরা ধান কিনছে খুব ধির গতিতে। এজন্য ধানের দাম নিম্মমুখি। তবে জুলাই মাসে কিছুটা ধানের দাম বাড়তে পাবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টারা বলছেন, ধান ব্যবসায়ীদের এমন দায়সারা কথা বললে হবেনা। সরকারকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নয়তো বা দেশে এখন কৃষি পণ্য উৎপাদিত হার কমে যেতে পারে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার বাগমারাপাড়া গ্রামের কৃষক হযরত আলী। চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ বিঘা জমিতে বি-৭৬ জাতের ধান চাষ করেছেন। শুক্রবার তিনি ধান কেটে মাড়াই করেছেন।
কৃষক হযরত আলী বলেন, ২৫ বিঘা ধান মেশিন দিয়ে কেটে স্থানীয় একাধিক ধান ব্যবসায়ী কাছে বিক্রির জন্য গিয়েছিলেন। কেউ ধান ক্রয় করতে চাচ্ছেনা। অবশেষে অন্য এক ব্যবসায়ী ৮০০ টাকা দরে প্রতিমণ কেনতে রাজি হয়। তিনি বলেন, এ বোরো ধান চাষে সেচসহ অনেক খরচ হয়েছে। ৮০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠবেনা। এতে তার কম পক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে।
বোরো ধান চাষ করে শুধু তানোরের কৃষক হযরত আলী একাই নয়, বাজারে ধানের দাম না পেয়ে লোকসানে হাজারো কৃষক। এতে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে কৃষকদের মাঝে।
রাজশাহীর মোহপুর উপজেলার মেলান্দী গ্রামের কৃষক অনিক কুমার। চলতি বছর ৪০ বিঘা জমিতে তিনি আলু চাষ করেছিলেন। আলু হিমাগারে সংরক্ষণ আছে। কিন্ত বর্তমানে আলুর বাজার প্রতি কেজি ৮ টাকা চলছে। আর তার উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতিকেজিতে খরচ হয়েছে ১৯ টাকা। শেষ পর্যন্ত আলুর দাম না বাড়লে তার লোকসান হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
এ গল্প শুধু অনিল কুমারের একাই নয়, আলু চাষ করে গত বছর থেকে শতশত কৃষক দাম না পেয়ে অনেকে লাখ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। অনেক চাষী ব্যাংক লোন পরিশোধ না করতে পেরে ব্যাংকে ভয়ে বাড়ি ছাড়া হয়েছে। চলতি বছরেও এমন শঙ্কায় করছেন কৃষকেরা।
রাজশাহীঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ চাঁপাইনবাবঞ্জ জেলা আমে জন্য বিখ্যাত। আম চাষীরা জানান, ১০ বছরের মধ্যে আমের দাম এতো কম হয়নি। এ বছর আম কেনার ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছেনা। বর্তমানের প্রতি কেজি আম ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এতে করে বাগান মালিকদের উৎপাদন খরচ তো উঠবে না বরং বড় লোকসানে পড়বে।
এদিকে গত বছর থেকে পেঁয়াজ ও রসুন চাষীরা ন্যায় দাম না পেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। বাজারে পেঁয়াজের দাম একেবারে নাই বললেই চলে। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। রসুনের দাম চলছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। কৃষকেরা বলছেন বিশেষ করে রসুনের দাম ২০০ টাকা কেজি হলে কৃষকেরা কিছু লাভবান হবে।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামে জাহাঙ্গীর নামের দুই রসুন চাষী বলেন, গত বছর দুই বিঘা রসুন চাষ করে পানি দামে বিক্রি করতে হয়েছে। চলতি বছরও দুই বিঘা চাষ করা হয়েছে। এ বারে বাজারে রসুনের দাম না থাকায় বাড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। গত বছরের মত দাম না পেলে আগামীতে আর রসুন চাষ করবেনা বলে জানান তারা।
রসুন চাষীরা বলেন, দেশে যে পরিমাণ রসুন চাষ হয় তাতে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্ত দেশের দেশি রসুন থাকা শর্ত চায়না রসুন আমদানীর কারণে দেশের কৃষক ধরা খাচ্ছে চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, ধান আম পেয়াজ রসুন আলু যে পরিমান উৎপাদন হয় তা দিয়ে দেশে খাদ্য ঘার্তিপূরণ করছেন কৃষকেরা। একটার পর একটা আবাদে লোকসানে পড়ছে কৃষক। কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায দাম যেন পায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।