সর্বশেষ সংবাদ :

হামের ‘বিভীষিকা’ কাটার আগেই ডেঙ্গুর শঙ্কা

সানশাইন ডেস্ক: হামের প্রাদুর্ভাব ও এর কারণে গত তিন মাসে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ‘ব্যতিব্যস্ত’, তখন বর্ষা আসার আগেই চোখ রাঙাতে শুরু করেছে আরেক প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গু।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ় আসতে এখনো পাঁচ দিন বাকি থাকলেও এখনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করেছে। চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এইডিস মশাবাহিত এ রোগটিতে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের শুরু থেকে ৮ জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ জন।
এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ডেঙ্গু যুক্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
পরের বছর ১ লাখ ১২১৪ জন আক্রান্ত এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে ১ লাখ ২৮৬১ জন আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। সরকারের তরফেও বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে একটি সারা বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। সে কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কাঠামোবদ্ধ তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এবার ডেঙ্গু মোকাবেলা সহজ হবে না। রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক কর্মশালায় তিনি বলেন, “ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
“এ সংকট মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়; বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে। আমি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের চাপ দিতে পারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে বলতে পারি। কিন্তু শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করতে পারি না। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যে কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লড়াই।”
ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘টোটাল ফাইট’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান এবং কচুরিপানাযুক্ত এলাকা পরিষ্কার না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।” ডেঙ্গুর প্রতিরোধব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করা কঠিন মন্তব্য করে মন্ত্রী আক্রান্তদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এর বাহক এইডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দিতে বলছেন। তাদের মতে এর জন্য প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে সিটি করপোরেশনগুলোকেই। অথচ এ বিষয়ে তাদের কার্যক্রম নিয়ে কেবলই হতাশা নাগরিকদের মুখে। রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা যাকের ভূঁইয়া বলেন, তাদের এলাকায় মশার উপদ্রব ‘চরম পর্যায়ে’। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা এসে ফগার দিয়ে ধোঁয়া দিয়ে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পরই আবার সেখানে মশা উড়তে দেখা যায়।
মালিবাগের বাসিন্দা তন্ময় চন্দ অভি বলেন, ঈদের ছুটিতে বেশিরভাগ মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ছিলেন। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় বৃষ্টিও হয়েছে। ফলে বাসা-অফিসগুলোর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি এবং ঢাকার বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে ডেঙ্গু নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন তিনি।
মুগদার বাসিন্দা মো. মাশরাফি অভিযোগ করে বলেন, “সিটি করপোরেশন প্রতিবছরই মশক নিধনের নামে কতকিছু করে, কিন্তু ইতিবাচক ফল আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকেশ রায় এবং মৌমিতা ধরেরও একই অভিযোগ। তাদের মতে, মশা মারতে সিটি করপোরেশন কর্মীরা যে ফগিং মেশিন ব্যবহার করছে, তার ধোঁয়ায় কোনো সুফল মিলছে না।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর সঙ্গে বৃষ্টিপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। “বৃষ্টি হলে বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্রে পানি জমে, অনেক জায়গায় বেজমেন্টেও পানি আটকে থাকে। এসব কারণে এইডিস মশার প্রজননস্থল বেড়ে যায়। একইসঙ্গে এ সময় তাপমাত্রাও মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল থাকে।
“এ কারণেই জুন মাস থেকে এইডিস মশার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সঙ্গে জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বাড়ে।” হাম ও ডেঙ্গুর একসঙ্গে বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, “দুটো রোগই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে। একসঙ্গে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”
তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। ড. বাশার বলেন, “আমি উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েকটি কর্মসূচিতে গিয়েছি। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখা এবং ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট প্রস্তুত রাখা গেলে চাপ সামলানো সম্ভব হবে।”
মশক নিয়ন্ত্রণে ফগিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “ধোঁয়া দেওয়া বা ফগিং মোটেও কার্যকর নয়। আমি বহুবার বিভিন্ন ফোরামে এবং সাংবাদিকদের কাছেও এ কথা বলেছি। এতে শুধু পরিবেশের উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। “ফগিং করলে শব্দ হয়, নগরবাসী দেখে মনে করে সিটি করপোরেশন কাজ করছে। এ কারণে এটি জনপ্রিয়। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা খুব সীমিত।”
তবে পানিতে প্রয়োগ করা লার্ভিসাইড কার্যকর বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দ এবং ব্যয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন বাজেট নথি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মিলিয়ে এ খাতে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএনসিসির মশক নিয়ন্ত্রণ বাজেট ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৪৯.৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৮৭.৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে ডিএসসিসির ২০২২-২৩ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ৩০.৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৬.২৫ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫৩.৭৫ কোটি টাকা হয়।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা আরও বাড়িয়ে ৫৭.৪৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধির পরও রাজধানীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কোনো অগ্রগতি না দেখায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, তাদের বর্ষাপূর্ব লার্ভা জরিপে ৬৩টি ওয়ার্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে রোববার (৭ জুন) থেকে এক সপ্তাহের বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে।
একই সময়ে ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ৫৪৬টি স্কুলে লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও নোভানিউরন ট্যাবলেট প্রয়োগের মাধ্যমে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে নগরবাসীর জন্য ডিএনসিসির সেবা কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার প্রতিশ্রুতি দেন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। বিরাজমান পরিস্থিতির মধ্যেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, এইডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে শনিবার থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।
ওইদিন রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে ডিএসসিসি এলাকায় এ অভিযানের উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সচেতনতা বৃদ্ধির পরও অবহেলা দেখা গেলে কঠোরভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। যেখানেই এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানেই আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ জরিমানা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফগিং ও রাসায়নিক নির্ভর কার্যক্রমে জোর থাকলেও টেকসই লার্ভা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় মশকনিধন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক, নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ঢাকায় বেসিক প্ল্যানিং স্ট্যান্ডার্ড মানা হয়নি। ভবনগুলোর মাঝখানে ময়লা জমে থাকা, খাল-বিলের স্থবির পানি এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজায়ন ও জলাশয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।”
তবে ডিএসসিসির প্রধান কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আসিফ ইকবাল নাগরিকদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “মশা শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত কীটনাশক (টেমেফোস ও ম্যালাথিয়ন) কার্যকর। ফগিংয়ের স্প্রে মশার গায়ে লাগলেও তা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় না বলেই মানুষের কাছে এটি অকার্যকর মনে হতে পারে।” আগামীতে ডিএসসিসির ‘বিটিআই’ নামে ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক একটি বায়োপেস্টিসাইড ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যার পরীক্ষামূলক ফলাফল সন্তোষজনক।”


প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬ | সময়: ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর