, , ।
নুরুজ্জামান,বাঘা :
মুসলিম স্থাপত্তের নিদর্শন সংরক্ষন করার লক্ষ্যে জাতীয় প্রত্নতত্ব বিভাগের উদ্যোগে রাজশাহীর বাঘায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি আঞ্চলিক জাদুঘর । যা দেখে উজ্জিবিত হবে আজকের প্রজন্ম। কিন্তু বাস্তবে সেটি হচেছ না। এখানে জাদুঘর উদ্বোধন করার সময় যে পরিমান তৈজসপত্র সংরক্ষন করা হয়, আজ অবদি সেগুলোই রয়ে গেছে। কথা ছিলো, পুরনো স্থাপনা থেকে কিছু নিদর্শন এখানে আনা হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে মানুষের উপস্থিতি দিন-দিন কমে আসছে। এতে করে জৌলুস হারাচ্ছে বাঘা জাদুঘর।
এলাকার সুধীজনরা বলছেন, বাঘা একটি প্রাচীন জনপদ। যখন ইউরোপে বাতি জ্বলেনী তখন বাঘায় বাতি জ্বলেছে। বাঘা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক পটভুমি। আজ থেকে ৬’শ বছর পূর্বে এখানে পোড়া মাটির ব্যবহার হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানে রয়েছে সুলতানি আমলের কারুকাজ খচিত ঐতিহ্যবাহী বাঘা শাহী মসজিদ, বিশাল আকৃতির দিঘী এবং হযরত শাহদৌলার মাজার সহ একাধিক ওলি আওলিয়াদের মাজার ও কারুকাজ খচিত নারীদের জন্য পৃথক মসজিদ।
বাংলাদেশ প্রাথমিক এবং গনশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রত্নতাত্ত্বিক(আরকলজি)বিভাগ এর সাবেক মহা-পরিচালক রতন চন্দ্র পন্ডিত সম্প্রতি বাঘা পরিদর্শনে এসে বলেন, সারা দেশে ৫ শ’২৭ টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এ সব নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্ত্বা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে। যার বাস্তব কিছু নিদর্শন রয়েছে বাঘায়। সরকার চাইলে এই এলাকাটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সুলতানী আমলে বাঘায় একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। তখন এখানে প্রায় দেড় কিলো স্কয়ার এলাকা নিয়ে নগর সভ্যতা গড়ে উঠে। এর নিদর্শন এখনো রয়েছে । বাঘা মাজার থেকে সীমানার মধ্যে যে কোন এলাকায় দুই থেকে পাঁচ ফিট মাটি খনন করলেই বেরিয়ে আসে প্রাচীন আমলের ইট এবং পৌড়া মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র। এ সমস্ত ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা ও প্রদর্শনের জন্য বাঘায় তৈরী করা হয় একটি আঞ্চলিক জাদুঘর। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে হযরত শাহদৌলার মাজার, সু-বিশাল দিঘী-সহ অসংখ্য প্রচীন ঐহিত্য। যা দেখার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে পিকনিক কর্ণার।
জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান দবির হোসেন জানান, এখানে ডিজিটাল ম্যাশিনে প্রিন্ট করা ২৩ টি মসজিদের ছবি, প্রচীন আমলের কোরআন শরিফ, কিছু মাটির পাত্র, কারুকাজ খচিত পুরাতন ইট, টাইল্স, ব্রোঞ্চের তৈরী পাত্র ,পোড়া মাটির বল ও একটি পাথরের উপরে লেখা আরবি হরফ ছাড়া তেমন কিছু নেই। যে কারনে মানুষের উপস্থিতি দিন-দিন কমে আসছে।
দবির হোসেন বলেন, এখানে শৈল্পিক কারুকাজ খচিত কোন উপকরণ নেই। বর্তমানে মুসলিম স্থাপত্তের নিদর্শন সংরক্ষন হিসাবে দেশে যে ১৫ টি জাদুঘর রয়েছে সেখানে লোহা,তামা ব্রঞ্চ ইত্যাদি উপকারণ দ্বারা তৈরী জিনিষ পত্র এবং প্রাচীন রাজা-বাদশাদের ঢাল-তলোয়ার, আধুনিক বিদ্যুৎ বাতির পরিবর্তে হারিকেন, হ্যাচাক, পিতলের তৈরী কুপ, লোহার সিন্দুক এবং বেত সহ কাঠের তৈরী অনেক রকম সামগ্রী থাততে পারতো। যা দেখে উজ্জিবীত হতো আজকের প্রজন্ম। তিনি এই জাদুঘরে নতুন-নতুন উপকরণ তোলার জন্য সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরে আবেদন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
বাঘার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার মনোয়ারুল ইসলাম মামুন বলেন, আমি গত কয়েকদিন আগে একজন আত্নীয়কে দেখানোর জন্য ১৫ টাকা টিকিট করে জাদুঘরে প্রবেশ করে ছিলাম। আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। কারণ গত ৮ বছর পূর্বে যা দেখে ছিলাম, এখনও সে গুলোই রয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখানে ঐহিহ্যবাহী বিভিন্ন মসজিদের ছবি সংরক্ষন এর পাশা-পাশি পরিবিবির সমাধিস্থলের ছবি রয়েছে। তাঁর মতে, দেশ এখন মধ্যম আয় থেকে উন্নত আয়ের দিকে আগ্রসর হয়েছে। গ্রামের অনেকের ছেলে-মেয়েরা এখনো মেট্ট্রোরেল ,পদ্মাসেতু কিংবা কর্ণফুলি র্টানেল দেখেনি। চাইলে সেসব ছবিও রাখা যেতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ পত্নত্তত্ব বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ও বাঘার কৃতি সন্তান শফিকুল ইসলাম মুকুট বলেন,আমার প্রচেষ্টা ছিল এখানে মুসলিম স্থাপনা দিয়ে একটি জাদুঘর করবো। সেটি সার্থক হয়েছে। জাদুঘর এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে গবেষকরা আসেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্ত্বা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে৷ এ গুলো রক্ষা ও সংরক্ষন করার দায়িত্ব সকলের। আমি এই জাদুঘরটি উদ্বোধনের সময় স্থানীয় লোকজনের কাছে এমনটি দাবি রেখেছিলাম, মুসলিম নির্দশন যদি কারো কাছে থাকে তবে তা জাদুঘরে জমা দেয়ার জন্য । প্রয়োজনে সেই নির্দশনের নিচে দাতার নাম উল্লেখ থাকবে। তবে এটি খুব বেশি ফলপ্রসু হয়নি। আমি অচিরে প্রত্নতত্ব বিভাগের সাথে কথা বলে উপকরণ বাড়ানোর চেষ্টা করবো। তিনি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সানশাইন /শামি