, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত কঠিন ও তরল বর্জ্যে নদী-বিলের ভয়াবহ দূষণ ও দখল পরিস্থিতি তুলে ধরে জরুরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পদ্মা থেকে নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল-দূষণমুক্ত করা এবং পুনঃখননের দাবিতে রবিবার বায়া এলকায় বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টারের সেমিনার কক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও বারসিক যৌথভাবে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী, পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা খাতুন, বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নদীতে প্রতিদিন বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যা পরিবেশের জন্য হুমকি। বক্তারা বলেন, নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা ও বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। একসময় স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব নদীর পানি এখন কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত। তলদেশে পলি ও প্লাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মাছসহ জলজ প্রাণীর উপস্থিতি কমে গেছে। এতে স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও নগরের নিম্নাঞ্চলে জমা হওয়া দূষিত পানি সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণাহার বিলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। হাজার হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এসব বিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বর্তমানে দূষিত পানিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, মাছ ও জলজ উদ্ভিদের উৎপাদন কমছে এবং কৃষিজমিতে দূষিত পানি ঢুকে পড়ায় ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, নিম্নপ্রবাহে এই দূষিত পানি নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ অব্যাহত থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয়দের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের অভিযোগ বাড়ছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মৎস্যজীবী ও কৃষকসহ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
বক্তারা বলেন, এটি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি বৃহত্তর পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন থেকে কয়েক দফঅ দাবি উত্থাপন করা হয়। সেগুলো হলো, পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা, বারাহী ও নবগঙ্গা নদী অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে। রাজশাহী নগরের আধুনিক ও সমন্বিত তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং দ্রুত স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে। সকল শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নিশ্চিত করে কঠোর মনিটরিং চালু করতে হবে। বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গা নদীসহ সংযোগ বিলসমূহে সরাসরি ড্রেন সংযোগ বন্ধ এবং দখল-দূষণের উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুণ-যুব, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে রাজশাহী অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এইসময় নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী এগুলো বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করেন, এবং নদী ও বিল রক্ষায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।