, , ।
সবুজ ইসলাম: ৪ লক্ষাধিক ভোটার নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর)। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উভয়েই মাঠে সক্রিয় থাকায় ভোটের সমীকরণ দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় দুই পক্ষই নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে।
এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে পূর্ণরায় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপিতে এই অঞ্চলের জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ শফিকুল হক মিলন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ায় তৃণমূল বিএনপিতে উচ্ছ্বাস ফিরে এসেছে। এছাড়াও দলের ভিতরে যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তারাও মিলনের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির ঐতিহ্যবাহী সমর্থন ও শক্ত সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভর করে তিনি নির্বাচনী মাঠে বেশ আত্মবিশ্বাসী। বিভিন্ন বাজার, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগে অংশ নিয়ে তিনি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। বিএনপির প্রার্থী উন্নয়নে বৈষম্য দূর করা, কৃষি ও ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীও পিছিয়ে নেই। এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের টানা ২৮ বছরের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। তিনি পবা ও মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামির সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচিত মুখ। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কারণে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক তার পক্ষে রয়েছে বলে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মনে করছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি উন্নয়ন, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
তবে ভোটাররা বলছেন ভিন্ন কথা। দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কৃষিবান্ধব দুই উপজেলার প্রান্তিক উন্নয়নে যে প্রার্থী কাজ করবেন তারা তাকেই ভোট দিবেন। পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের সাইরপুকুর এলাকার কৃষক সায়েদুল ইসলাম বলেন,“বিগত দিনে অনেক এমপি, চেয়ারম্যান আমরা দেখেছি কিন্ত কেউ আমাদের কৃষকদের নিয়ে আলাদাভাবে ভাবেনি কিংবা কাজ করেনি। যখন কৃষিপণ্যের দাম কম থাকে তখন বিলের সবজিগুলো কেউ নিতে চায়না। তখন বাধ্য হয়ে আমাদের সেই সবজিগুলো ফেলে দিতে হয় অথবা গরু-ছাগল কে খাওয়াতে হয়। আমাদের এখানে যদি সাশ্রয়ীমুল্যে ফসল সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।”
বড়গাছি ইউনিয়নের কালুপাড়া গ্রামের সাইনুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এখানে রাস্তা-ঘাটের সেইরকমভাবে কোন উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিন থেকে রাস্তা প্রশস্ত এবং সংস্কার করা হয়নি, যার ফলে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নয়ন ঘটেনি। সামনে নির্বাচনে যে প্রার্থী আমাদের কথা দিবে, আমাদের রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন করবে আমরা তাকেই ভোট দিবো।”
নওহাটা পৌরসভার পিল্লাপাড়া গ্রামের আসাদুল ইসলাম বলেন,“আমাদের এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব। জনগণের তুলনায় কর্মসংস্থান নাই। এখানে যদি সরকারিভাবে কল-কারখানা নির্মাণ করা হতো তাহলে এখানে অনেক কর্মসংস্থান তৈরী হতো। আমরা সেই প্রার্থীকে এমপি হিসেবে চাই, যে আমাদের এলাকায় কর্মসংস্থানের উপরে গুরুত্ব দিবে।”
মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ এলাকার দিনমজুর রহিম আলী বলেন,“অনেক এমপি মন্ত্রী গেছে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের বদল হয়নি। আমাদের এলাকার কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন করবে আমরা এরকম প্রার্থীকেই এমপি হিসেবে চাই। আমরা তাকেই ভোট দিব।” মৌগাছি ইউনিয়নের বিদিরপুর এলাকার হাফিজ আব্বাস বলেন,“একজন জনপ্রতিনিধির কাছে তো আমাদের বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। আমাদের রাস্তা-ঘাট সহ এলাকার সার্বিক বিষয়ে যে কাজ করবে এমপি হিসেবে আমরা তাকেই চাই। আমাদের এলাকার বিভিন্ন সমস্যায় যাকে আমরা সবার আগে কাছে পাবো তাকেই আমরা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবো।”
তবে দুই দলের প্রার্থীরা জানান, আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হলে তারা পবা-মোহনপুরের সার্বিক উন্নয়নকে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করবেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি মনোনীত দাঁড়ি পাল্লা প্রতিকের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন,“পবা-মোহনপুরের সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চাই। সুদ,ঘুষ,চাঁদাবাজি থেকেও মুক্তি চাই। ১৯৯১ সালে জোটের প্রার্থীরা যেরকম সাড়া পেয়েছিল বর্তমানেও আমি ভোটারদের কাছে থেকে একইরকম সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি আসন্ন নির্বাচনে আমি জনগণের দেওয়া বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়ে এই এলাকার উন্নয়ন করতে সক্ষম হবো। আপনারা দেখবেন পবা-মোহনপুর এলাকায় কৃষি পেশার সাথে জড়িত বেশিরভাগ মানুষ। এই অঞ্চলে ধান, পান, আলু ও আম চাষ বেশি হয়। সেগুলো যাতে সাধারণ কৃষক ভালো মুনাফায় বিক্রি করে লাভবান হতে পাারে সেইলক্ষ্যে দুই উপজেলায় কৃষি ভিত্তিক জোন তৈরী করা হবে। আমাদের কেন্দ্র থেকে ইশতেহার দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি পবা-মোহনপুরের উন্নয়নেও আমার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে।”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী শফিকুল হক মিলন বলেন,“পবা-মোহনপুরে মাটি ও মানুষের সাথে আমার দীর্ঘদিনের সখ্যতা। ১৯৮৩ সাল থেকে আমার রাজনীতি শুরু এবং পবা-মোহনপুরে ২০০৮ সাল থেকে আমি আছি। আমি জানি এই অঞ্চলের কোথায় কোথায় মানুষের কি কি সমস্য রয়েছে, নির্বাচিত হলে সেগুলো সমস্যা সবার আগে সমাধান করা হবে। এছাড়াও দুই উপজেলায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে, বেকারত্ব দূরীকরণ করতে বিশেষ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পবা-মোহনপুরে নগরায়ণ করা হবে। আপনারা দেখবেন রাজশাহী শহরে নগরায়ণ করতে আর জায়গা অবশিষ্ট নেই, দক্ষিণ পাশে নদী । সেইলক্ষ্যে আমার পবা-মোহনপুরে অনেক জায়গা আছে সেগুলোতে কল-কারখানা নির্মাণ করা হবে এবং পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পবা-মোহনপুরে সবচেয়ে যে বিষয়টি জরুরী তা হলো কৃষি পণ্য বিপণন ব্যবস্থা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে আমি শাহমখদুম বিমানবন্দরকে আন্তজার্তিক করতে উদ্যোগ গ্রহণ করবো এবং এখানকার কৃষি পণ্য যাতে বিদেশে সরাসরি রপ্তানি হয় সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিবো। এতে আমাদের সাধারণ কৃষকরা উপকৃত হবে। আশা করছি সামনের নির্বাচনে এই আসনে ধানে শীষ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।”
সব মিলিয়ে রাজশাহী-৩ আসনে এবারের নির্বাচন ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমে উঠেছে। দুই প্রার্থীর বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি ও মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ও জনস্বার্থের প্রশ্নে কার ওপর আস্থা রাখেন জনগণ সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফলাফল।