সর্বশেষ সংবাদ :

নগরীতে রাজবাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণের দাবিতে স্মারকলিপি

স্টাফ রির্পোটার: রাজশাহী নগরীর দরগাপাড়া মৌজায় অবস্থিত দিঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়ের নির্মিত রাজবাড়িটিসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণসহ তিন দফা দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।বুধবার দুপুরে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সাথে সাক্ষাৎ করে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেছেন রাজশাহীর নাগরিক সমাজ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী এবং রাজশাহীর ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষকসহ প্রমুখ।
সাক্ষাৎকালে পঞ্চকবির অন্যতম কান্ত কবি রজনীকান্ত সেনের বসতভিটা, মিঞাপাড়ায় অবস্থিত রাজা হেমেন্দ্র কুমারের বসতভিটা, উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটকের গুড়িয়ে দেয়া বসতভিটা, তালন্দ ভবনসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মহানগরী। অনেক আগে থেকে এই শহরটি প্রাচীন বাংলায় পরিচিত ছিল। রাজশাহী শহরের নিকটে প্রাচীন বাংলার বেশ কয়েকটি রাজধানী শহর অবস্থিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজশাহী ছিল প্রাচীন বাংলার পুন্ড্র সাম্রাজ্যের অংশ। বিখ্যাত সেন বংশের রাজা বিজয় সেনের রাজধানী ‘বিজয়পুর’ বর্তমান রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে অবস্থিত ছিল। মধ্যযুগে বর্তমান রাজশাহী পরিচিত ছিল রামপুর বোয়ালিয়া নামে। এর সূত্র ধরে এখনও রাজশাহী শহরের একটি থানার নাম বোয়ালিয়া। এরকম একটি ঐতিহ্যমন্ডিত শহরে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি বসবাস করেছেন এবং তাদের স্মৃতিবিজড়িত বাসস্থান রয়েছে। এমন একটি ‘ঐতিহাসিক’ বাড়ির অবস্থান রাজশাহী নগরের দরগাপাড়া মৌজায়। বাড়িটি বানিয়েছিলেন দিঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়। জনশ্রুতি আছে মহারানি হেমন্তকুমারী (১৮৬৯-১৯৪২) পুঠিয়া থেকে রাজশাহী শহরে এলে এই বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটির সামনে রয়েছে একটি নাগলিঙ্গম ফলের গাছ। ভবনটির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ছিল কি না, যাচাই না করেই সেটি ভাঙ্গার জন্য নিলামে তুলা হয়েছে যা মোটেই সঠিক হয়নি।
স্মারকলিপির দাবিসমূহ হলো- ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি ভাঙ্গার সাথে সংশ্লিষ্টদের কৈফিয়তের আওতায় আনতে হবে, নাগলিঙ্গম গাছ এবং বাড়িটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেইসাথে বাড়িটিকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; রাজশাহী জেলা এবং বিভাগে একটি প্রত্মতাত্ত্বিক জরিপ করতে হবে এবং সেগুলো ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; রাজশাহীতে অবস্থিত কান্ত কবি রজনীকান্ত সেনের বসতভিটা, মিঞাপাড়ায় অবস্থিত রাজা হেমেন্দ্র কুমারের বসতভিটা (একটি বিশেষ বাহিনীর দখলে আছে), তালন্দ ভবন (একটি বিশেষ বাহিনীর দখলে আছে) সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই দাবি সম্বলিত স্মারকলিপির অনুলিপি রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী শহিদুল ইসলাম, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আতিকুর রহমান আতিক, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাসের সভাপতি শামীউল আলীম শাওন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী নাদিম সিনা, হাসিবুল হাসনাত রিজভিসহ প্রমূখ।
এদিকে, রাজশাহী মহানগরীর সিপাইপাড়া এলাকায় অবস্থিত দিঘাপতিয়ার রাজবংশের রাজা হেমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়ের বাড়িটি আর না ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। বুধবার দুপুরে বোয়ালিয়া থানা ভূমি কার্যালয়ের কর্মচারীরা গিয়ে ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। যদিও পাশাপাশি দোতলা দুটি বাড়ির প্রায় সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে। শুধু মেঝের নিচে থাকা সুড়ঙ্গের ইটগুলো তোলা বাকি আছে। গতকাল দুপুরে বাড়িটি পরিদর্শনে গিয়ে হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, এ বাড়ির বয়স আনুমানিক ১২০ বছর। এখন যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখানে থাকা নাগলিঙ্গমের গাছটি যেন কাটা না হয়, এটি খুবই বিরল। মাহবুব সিদ্দিকী আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা হয়তো এখানে আসেননি। তাঁরা না দেখেই এটা নিলাম দিয়েছেন। তাঁরা এখানে এলে হয়তো এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বুঝতে পারতেন।
মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বাড়ির নিচে সুড়ঙ্গের মতো থাকলেও এটি মূলত সুড়ঙ্গ নয়, এটি প্রাচীন নির্মাণশৈলীর ছাপ। বাড়ির নিচ দিয়ে বাতাস চলাচলের জন্য এটি করা হতো। তবে বাড়িটিতে নিয়মিত যাতায়াত করা কলেজশিক্ষক আকতার বানুর দাবি, পেছনের দোতলা বাড়ি থেকে সামনের একতলা বাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল ওই সুড়ঙ্গ। নিরাপত্তার কারণে এটি করা হতে পারে।
রাজবংশের জায়গাটি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীত পাশে, প্রধান সড়ক ঘেঁষে। জনশ্রুতি আছে, পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারী রাজশাহী এলে এই দোতলা বাড়িতে থাকতেন। রাজপরিবার চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত ছিল। স্বাধীনতার পর বাড়িটি ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমানের নামে ইজারা দেয় সরকার। মনোয়ারা রহমান রাজশাহীর প্রথম নারী উদ্যোক্তা। তিনি এ বাড়িতে মহিলা কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান নামের একটি সংগঠন চালাতেন। এর মাধ্যমে তিনি হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রায় ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিলেন। মনোয়ারা রহমান ২০০৯ সালে মারা গেলে বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সম্প্রতি এ বাড়ির ইজারা বাতিল করে বোয়ালিয়া থানা ভূমি কার্যালয়। এরপর পরিত্যক্ত বাড়িটি নিলামে বিক্রি করা হয় ১ লাখ ৫২ হাজার টাকায়। নিলামের ক্রেতা শ্রমিকদের দিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে বাড়িটি ভেঙেছেন।
মঙ্গলবার এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়। জেলা প্রশাসন বাড়িটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। বোয়ালিয়া থানা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসন বাড়িটি এখন যেভাবে আছে, সেভাবেই আপাতত রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ দুপুরেই আমাদের অফিস থেকে লোকজন গিয়ে সেখানে লালসালু টাঙিয়ে দিয়ে এসেছেন। শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।’
আরিফ হোসেন আরও বলেন, ‘জায়গাটা নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত ছিল। আপাতত সবকিছুই স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেয়ালের যেসব ইট ভাঙা হয়ে গেছে, সেগুলো নিলামে নেওয়া ব্যক্তি সরিয়ে নেবেন। তারপর আর একটি ইটও তুলতে পারবেন না। যেভাবে যা আছে, সেভাবেই থাকবে। কর্তৃপক্ষ আগে সবকিছু যাচাই-বাছাই করে দেখবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’


প্রকাশিত: December 4, 2025 | সময়: 7:31 am | সুমন শেখ

আরও খবর