সর্বশেষ সংবাদ :

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় ভরসা ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’

সবুজ ইসলাম: রাজশাহী পবা উপজেলার মধূসুদনপুর এলাকার ষাটোর্ধ্ব বয়সী নিলুফার বেগম। কয়েকদিন থেকে বাড়তি প্রেশার এবং মাথা ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলেন। কমিউনিটি ক্লিনিকে এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। সেখান থেকে ব্যবস্থাপত্রের সাথে আবার বিনামূল্যে পেয়েছেন ৪ প্রকার ওষুধ। জানতে চাইলে নিলুফার বেগম বলেন, “বাইরে ডাক্তার দেখাতে গেলে ভিজিটিং নিবে পাঁচশো টাকা। আবার ওষুধ কিনতে হবে। সেজন্য বাইরে আমি যাই না। এখানে ডাক্তারও আছে আবার আমি নিয়মিত ফ্রীতে ওষুধও পাই। এজন্য বাড়ির পাশের এই ক্লিনিক আমার কাছে আশির্বাদস্বরুপ।”
শুধু পবার নিলুফার বেগম না। মোহনপুর, তানোর, বাগমারা, পুঠিয়া, দূর্গাপুর, চারঘাটসহ রাজশাহী জেলার প্রতিটি উপজেলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবায় ভরসার নাম কমিউনিটি ক্লিনিক। সকল শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা এই ক্লিনিক। বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় এবং সেখানে বিনামূল্যে সাধারণ রোগের ওষুধ পাওয়া যায় বলে এখানে সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বেড়েছে পূর্বের তুলনায়।
এখানে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারীগণ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন, যেমন: স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সেবা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধকরণ; প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবা প্রদান; মা ও শিশুর খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়ে সহায়তা প্রদান; ছোঁয়াচে রোগবালাই থেকে দূরে থাকার বিষয়ে পরামর্শ দান এবং জটিলতর রোগের চিকিৎসার জন্য উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়ে থাকে।
সরেজমিনে জেলার কয়েকটি উপজেলায় গেলে দেখতে পাওয়া যায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গনে সকাল থেকেই চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের লম্বা সিরিয়াল দেখা যায়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি এখানে ২৭ প্রকার ঔষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। প্রিতি মনি নামের এক চিকিৎসাগ্রহীতা বলেন,“কমিউনিটি ক্লিনিক আমাদের জন্য অনেক উপকারী। আমরা এখান থেকে নিয়মতি ঔষুধ সহ প্রেসক্সিপশন পেয়ে থাকি। আমরা চাই এই ক্লিনিকগুলো আরো আধুনিক মানের এবং এখানে রোগ নির্ণয়ের জন্য মেশিন বসানো হোক। যাতে আমরা চিকিৎসা সেবা আরো ভালো পাই।”
সুজন আলী নামের এক রোগি বলেন,“বাইরে এখন ডাক্তারদের যে সিন্ডিকেট। টাকা ছাড়া কোন পরামর্শ পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা এই ক্লিনিকে ডাক্তারদের পরামর্শের পাশাপাশি এখান থেকে টাকা ছাড়াই ওষুধ পাই। এটি আমাদের জন্য অনেক উপকারী।”
পবা উপজেলা মধূসুদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি নূর আলম বলেন, “এই কমিউনিটি ক্লিনিকের কারণে দেশের দরিদ্র মানুষ আজ সঠিক ভাবে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোতে রোগির সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক রেড়েছে। আমার এখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন রোগীকে সেবা দেয়া হয়। মাঝে মাঝে রোগির সংখ্যা এর চেয়ে বেশিও হয়।”
এই ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা হামিদা বেগম জানান, এই ক্লিনিকে সব চিকিৎসা হয়। ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হয়। আগে শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো। সময় লাগতো বেশী, টাকাও খরচ হতো। কিন্তু এখন আর শহরে যেতে হয় না। আমরা সকল রোগের চিকিৎসা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেই পাচ্ছি।
কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করে জানা যায়, এখানে সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যার আওতায় গর্ভবর্তী মহিলাদের প্রসব পূর্ব (প্রতিষেধক টিকাদানসহ) এবং প্রসব পরবর্তী (নবজাতকের সেবাসহ) সেবা দেয়া হয়। এই ক্লিনিকগুলোতে সময়মত প্রতিষেধক টিকাদান শিশু ও কিশোর কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়। জনগণের জন্য বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণের জন্য ফলপ্রসূ ব্যবস্থ্য গ্রহণ ও সেবা প্রদান করা হয়। যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, কালা-জ্বর, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সেগুলোর সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। সাধারণ জখম, জ্বর, ব্যথা, কাটা-পোড়া, দংশন, বিষক্রিয়া হাঁপানী চর্মরোগ, ক্রিমি এবং চোখ, দাঁত ও কানের সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণ, যেমন-কনডম, পিল, ইসিপি ইত্যাদি সার্বক্ষণিক সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করা হয়। জটিল রোগিদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সেবা প্রদান করে দ্রুত উচ্চতর পর্যায়ে রেফার করা হয়। সদ্য বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নিবন্ধিকরণ ও সম্ভাব্য প্রসব তারিখ সংরক্ষণ করতে হয়। মহিলা ও কিশোর-কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা সনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে থাকে এই কমিউনিটি ক্লিনিকে।
সারাদেশে ১৩ হাজার ৩৭৬ টি এবং রাজশাহীতে ২৩৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে চালু রয়েছে। সরকারের পৃথক দুটি জরিপে এসব ক্লিনিক নিয়ে ৮০ থেকে ৯৮ শতাংশ মানুষ তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের এর এক জরিপে দেখা গেছে, বাড়ির পাশের ক্লিনিক থেকে ওষুধ আর পরামর্শ পেয়ে ৮০ শতাংশ মানুষই সন্তুষ্ট। জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এর জরিপে দেখা যায়, সেবা নিয়ে ৯৮ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ এস আই এম রাজিউল করিম জানান প্রাথমিক চিকিৎসা সেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। তিনি বলেন,“প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা মানুষের দৌরগৌড়ায় পৌছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। রাজশাহীতে ২৩৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবাসহ ২২ প্রকার ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের এখানে সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং এফডøবিউপিএ কোনটির পদ ফাঁকা নেই। তবে কিছু ভবন পুরানো হয়ে যাওয়ায় তা সংষ্কার করতে হবে। যাবতীয় চিকিৎসা সেবা সহ বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে ওষুধ সরবরাহ করতে দেরী হয়ে গেলে ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের সংকট দেখা দেয়, তবে তা খবুই সামান্য সময়ের জন্য।


প্রকাশিত: November 21, 2025 | সময়: 5:19 am | সুমন শেখ

আরও খবর