, , ।
রকিবুল হাসান রকি, পুঠিয়া: এক সময় প্রবল বেগে বইত মুসা খাঁ নদ। নদে চলাচল করত বড় বড় নৌকা। বর্তামনে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রায় সারা বছর দেখা যায় না পানি। বর্ষাতেও হয় না আগের মতো স্রোত। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসনের গাফিলতির সুযোগে দখলে-দূষণে মৃতপ্রায় এখন এই খরস্রোতা নদটি।
নদের পার্শ্ববর্তী এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মার শাখা বড়াল নদী। আর বড়ালের শাখা মুসা খাঁ নদ। প্রায় তিন যুগ আগে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মুসা খাঁ ও বড়ালের মুখে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে মুসা খাঁ নদে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এখন নদটি খনন করে পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন। অথচ আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও এই নদীতে সারাবছর স্রোত থাকতো। নদটি আরও প্রশস্ত ছিল, ছিল গভীরও।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া হাটে নদটি দখল করে বড় বড় দোকান ও গোডাউন তৈরি করেছে স্থানীয় কয়েকজন অসাধু ভূমিদস্যু ব্যবসায়ী। নদ দখলে অভিযুক্ত এসব হলেন, উপজেলার রায়পাড়া এলাকার মুদি ব্যবসায়ী আবু বাক্কার, পূর্ব কানাইপাড়া এলাকার মৃত লালু সরদারের ছেলে মানিক সরদার, পশ্চিম কানাইপাড়ার খুরশেদ আলম, কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার ‘এবি’ ক্যাবলের মালিক ইমদাদুল হক ইমদাদ, পূর্ব কানাইপাড়া এলাকার মৃত লালু সরদারের ছেলে রফিকুল সরদার, ঝলমলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার মৃত লতির সরদার ছেলে মিঠু সরদার এবং পূর্ব কানাইপাড়া এলাকার মৃত কালু সরদারের ছেলে মিঠু সরদার। এছাড়া আরও প্রায় ১২ জন ব্যক্তি নদের জায়গা দখল করে তৈরি করেছেন আড়ত ও দোকান।
এদিকে ঝলমলিয়া ব্রিজের পাশে নদের জায়গা দখল করে তৈরি হয়েছে একটি গ্রাম। গ্রামের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জ্যোৎস্না পট্টি’। এই গ্রামে বসবাস করেন মৃত আব্দুল জলিরের ছেলে নুরুল ইসলাম নুরু, রেহেনা বেগম সহ ৫-৭টি পরিবার।
জানা গেছে, নদের জায়গায় গড়া ওঠা এ গ্রামে বসবাসরত কয়েকজনের নামে বরাদ্দ ‘গুচ্ছগ্রামে’ রয়েছে সরকারি দেওয়া ঘর। সেখানে না গিয়ে মাদক ব্যবসার সুবাদে তারা জ্যোৎস্না পট্টিতে বসবাস করেন। দিনে-রাতে এ পট্টিতে চলে রমরমা মাদক ব্যবসা।
স্থানীয় একজন বীজ দোকানি অভিযোগ করে বলেন, ঝলমলিয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নদ দখল করে বৃহৎ গোডাউন তৈরি করেছে কানাইপাড়ার মানিক। এসিল্যান্ড ও ইউএনও গোডাউন ভাঙতে নির্দেশ দিলেও মানিক গোডাউন ভাঙেনি। তার অনেক টাকা, যে ব্যক্তি গোডাউন নিয়ে কথা বলে তার মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করে দেয় মানিক।
রাসেল নামের একজন বলেন, ঝলমলিয়া হাটে বেশিরভাগ নদের জায়গা দখল হয়ে গেছে। পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসন এগুলো দেখতে পায় না। ঝলমলিয়া হাটে মুসা-খাঁ নদের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে আছেন প্রভাবশালীরা।
ঝলমলিয়া বাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি মুন্সি শাখাওয়াত হোসেন বলেন, নদের বেশির ভাগ জায়গা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে। যে যার মতো অবৈধভাবে দখল করে বড় বড় গোডাউন ও দোকান তৈরি করে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। অনেকবার প্রশাসনকে অবগত করেছি কিন্তু নদ রক্ষায় প্রশাসনিকভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বিক্রেতারা জায়গার অভাবে মহাসড়কে বসছেন।
অনেক প্রভাবশালী নদে ইটের দালান ও টিনের ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছেন। সরকারি জায়গা অথচ দখলদাররা একহাত জায়গা দিতেও নারাজ। টিউবওয়েল বসানোর মত জায়গাও ঝলমলিয়া হাটে পাওয়া যায় না।
ঝলমলিয়া বাজার ব্যবসায়িক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম সরকার জানান, পুঠিয়া পৌরসভা হাটটি নিয়ন্ত্রণ করে। হাটের নির্দিষ্ট কোন আইন নেই। যে যার মত জায়গা দখল করে বাণিজ্য করছে। এতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয় জনসাধারণের। এসব বিষয়ে পৌরসভায় অনেকবার অভিযোগ করেছিলাম।
এসিল্যান্ড ও ইউএনও সরেজমিন পরিদর্শন করে দখলদারদের উচ্ছেদ নোটিশও দিয়েছিল। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে ঐতিহ্যবাহী মুসা খাঁ নদ সংস্কার করা হোক।
এ ব্যাপারে পুঠিয়া পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, মেয়র অথবা প্রশাসক দুজনকেই আমি বিষয়গুলো জানিয়েছি। কিন্তু কেউ এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা নেয়নি। আমি কি করবো?
পুঠিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাশ বলেন, বিষয়টি এখনও আমার নজরে আসেনি। সরেজমিন পরিদর্শন করব। সত্যতা পেলে দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিয়াকত সালমান বলেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদের নির্দেশনা আমাদের সব সময় থাকে। দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ করব। এ ছাড়াও নদটি খনন করার জন্য আমরা বরেন্দ্র অফিসে কথা বলব।