সর্বশেষ সংবাদ :

সার ডিলার নিয়োগে প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালা স্থগিতের দাবি ডিলারদের

স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালার খসড়া অনুমোদনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিসিআইসি সার ডিলাররা। তাদের অভিযোগ, সরকার সার ডিলারদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করে একতরফাভাবে এই নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। এতে ডিলারদের মধ্যে বিশৃৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এবং এর কারণে দেশে সারের সংকট প্রকট হতে পারে দাবি করেছে বিসিআইসি সার ডিলাররা।
বিদ্যমান সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ বহাল ও কমিশন বৃদ্ধির দাবীতে রাজশাহী জেলা শাখার বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়শেনের আয়োজনে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
রোববার রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে অত্র এসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ¦ ওছমান আলী বলেন, ৩০-০৯-২০২৫ ইং তারিখ মিডিয়ার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা ২০২৫ নামে একটি নীতি মালা কৃষি মন্ত্রণারয় কর্তৃক একতরফাভাবে খসড়া অনুমোদন দিয়েছে, যা আগামী জানুয়ারী-২০২৬ সালে কার্যকর করা হবে। সমগ্র বাংলাদেশের সার ডিলারদেরসংগঠন বিএফএ’র পক্ষ থেকে এই নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুমোদনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তারা। সেইসাথে ২০০৯ সালের নীতিমালা বহাল রাখারও দাবী জানান তিনি।
মানববন্ধনে তিনি আরো বলেন, রাজশাহী জেলায় মোট ইউনিয়ন ও পৌরসভা ৮৬টি এবং জেলায় বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছে ৮৯ জন এবং বিএডিসি ডিলার ১৩১ জন। সার ডিলার নিয়োগ ও সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯ মোতাবেক প্রতিটি ইউনিয়নে ১ জন সার ডিলার নিয়োগ এর বিষয়ে বলা হয়েছে। বর্তমানে নিয়োজিত বিসিআইসি ডিলারগণ তার ব্যবসায়িক ইউনিয়নে বিগত ৩০ বৎসর যাবৎ সুনামের সহিত কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। বিদ্যমান সার ডিলারগণ সরকারের সুষ্ঠু সার ব্যবস্থাপনায় এবং জাতীয় খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ জন পূর্বের নিয়োগকৃত বিসিআইসি সার ডিলারগণকে বহাল রাখার দাবি জানান জানানো হয়।

তিনি আরো উল্লেখ করেন ১৯৯৬ সাল হইতে বর্তমান পর্যন্ত সার বিক্রয়ে কমিশন বৃদ্ধি করা হয় নাই। ডিলার প্রথা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১০০ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। বর্তমানে জ্বালানী তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া গোডাউন ভাড়া, কর্মচারী বেতন, লোড-আনলোড খরচ, ব্যাংক সুদসহ আনুসাংগিক যাবতীয় খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পরও বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধি করা হয় নাই। তারা ১০০/- টাকার পরিবর্তে ৩০০/- টাকা বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।
আরো উল্লেখ করা হয় বিসিআইসি ডিলারগণ সব সময় সরকার নির্ধারিত বিক্রয় মূল্যে সার বিক্রয় করে থাকেন। যে সার তারা উত্তোলন সেই সার সঠিক সময়ে বিক্রি হয়না। কিন্তু তাদের সরকারের নিয়মানুযায়ী সার উত্তোলন করতে হয়ে। নতুন নীতিমালায় এখন আবার একজন ডিলারকে ৩টি গোডাউন রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা চালু হলে সার ডিলারগণ মারাত্বক ক্ষতির সম্মুখিন হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মানবন্ধন শেষে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান( অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব) এর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে তরা উল্লেখ করেন খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়ন করার আগে বিদ্যমান স্টেক হোল্ডার তথা সার বিপণন নিয়োজিত ডিলারদের মতামত নেয়া হয়নি বা এ সংক্রান্ত সভায় তাদেরকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অপরদিকে ডিলারদের ট্রাকযোগে সার পরিবহনের পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব/সিদ্ধান্ত ফাইল বন্দি। অসাধু ব্যবসায়ীদের শান্তি দেয়া হোক এতে তাদের আপত্তি নাই। আসন্ন ইরি-বোরো ধান উৎপাদনের পিক মৌসুম এ ক্রান্তিলগ্নে নতুন সার ডিলার নিয়োগের লক্ষ্যে প্রণয়নকৃত খসড়া নীতিমালার কার্যক্রমে অহেতুক বিদ্যমান সার ডিলারদের হয়রানি না করার জন্য জেলা প্রশাসক ও সভাপতি, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির নিকট সকল সার ডিলারদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন যেমন ব্যাহত হবে। এতে সার্বিকভাবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারাও প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। চলতি ইরি-বোরো ভরা মৌসুমে কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মত সার পৌঁছাতে না পারলে দেশ কাঙ্খিত খাদ্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়ে দেশে খাদ্য ঘাটতি পরিলক্ষিত হবে বলে উল্লেখ করেন তারা।
নতুন নীতিমালাতে একটি ইউনিয়নের ৩জন ডিলার নিয়োগ প্রস্তাব এবং প্রত্যেক ডিলারের ৩টি সেলস সেন্টার ও গুদাম থাকতে হবে যাতে পরিচালন ব্যয় ২০০৯ নীতিমালা থেকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে, প্রকারান্তরে সার বিপণনে অস্থির/অরাজকতা তৈরী হবে। বিনিয়োগ অনুযায়ী ডিলারের লোকসান বৃদ্ধিতে ডিলার ক্ষতিগ্রন্থ হবে। এমনিতেই বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে ডিলারগণ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। যেহেতু সার ডিলারগণ সরকার নির্দেশিত বিসিআইসি’র কারখানা থেকে সার নগদ মূল্যে ক্রয় করে কৃষকের নিকট বাকীতে বিক্রয় করে বকেয়া টাকা ফেরত পাচ্ছে না। ব্যাংক ও কিস্তিকৃত ঋনের টাকা পরিশোধ করতে অনেক ডিলারের ভিটেবাড়ী বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিলারের পরিচালন ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে কমিশন বৃদ্ধি পেলে ডিলার বাঁচবে আর ডিলার বাঁচলে কৃষি ও কৃষক বাঁচবে জানান তারা। ২০২৫ সালের সার ও ডিলার নিয়োগ নীতিমালার বাস্তবায়ন স্থগিত করে ২০০৯ সালের পরীক্ষিত বিদ্যমান নীতিমালা বহাল এবং বাস্তবতার নিরীখে কমিশন বৃদ্ধির পদক্ষেপ তুরান্বিত করার দাবী জানান তারা।
বাংলাদশে ফার্টিলাইজার এসোসিয়শেন, রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম ও সাবেক সভাপতি আবুল কালাম। এছাড়াও অত্র এসোসিয়েশনের অন্যান্য সদস্য এবং রাজশাহী সকল সার ডিলারগণ উপস্থিত ছিলেন।
বিসিআইসি সার ডিলারদের সংগঠন বিএফএ নওগাঁ জেলা শাখার একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়ালের কাছে তাদের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
এজন্য সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার খসড়া অনুমোদন স্থগিত করে ২০০৯ সালের পরীক্ষিত নীতিমালা বহাল রাখার দাবি বিসিআইসি সার ডিলাররা। রবিবার দুপুরে নওগাঁ শহরের সরিষাহাটির মোড়ে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএফএ নওগাঁ জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিজানুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে মিজানুর রহমান বলেন, সারের ডিলার নিয়োগের নতুন নীতিমালা করে ইউনিয়নভিত্তিক নতুন ডিলার নিয়োগ করা হবে, যা এই সময়ের জন্য বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নয়। কারণ বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী একজন ডিলারকে একটি গুদাম ও একটি বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু নতুন নীতিমালা অনুযায়ী একজন ডিলারকে ৩টি বিক্রয়কেন্দ্র এবং একটি গুদাম পরিচালনা করতে হবে। এতে করে ডিলারদের পরিচালনা ব্যয় তিন গুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু কমিশন আগের মতো প্রতি কেজিতে ২ টাকা থাকবে। এতে করে সার সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়ন করার আগে বিদ্যমান স্টেক হোল্ডার তথা সার ডিলারদের মতামত নেওয়া হয়নি বা এ সংক্রান্ত সভায় তাদেরকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এছাড়াও ডিলারদের ট্রাকযোগে সার পরিবহনের পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে। মিজানুর রহমান বলেন, আসন্ন ইরি-বোরো ধান উৎপাদনের পিক মৌসুম এই ক্রান্তিলগ্নে নতুন সার ডিলার নিয়োগের লক্ষ্যে প্রণয়নকৃত খসড়া নীতিমালার কার্যক্রমে অহেতুক বিদ্যমান সার ডিলারদের হয়রানি না করার জন্য আপনার সানুগ্রহ হস্তক্ষেপ কামনা করছি। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন যেমন ব্যাহত হবে সার্বিকভাবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারাও প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। চলতি ইরি-বোরো ভরা মৌসুমে কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মত সার পৌঁছাতে না পারলে দেশ কাঙ্খিত খাদ্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়ে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএফএ নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দিপক কুমার সরদার, বিএফএ কেন্দ্রীয় কমিটির পরিচালক ও বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন) সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশন নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি লিটন কুমার দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে বিএফএ নওগাঁ কার্যালয়ের সামনে সড়কের এক পাশে দাঁড়িয়ে মানবন্ধন করেন নওগাঁর বিসিআইসি সার ডিলাররা।
এসময় বক্তারা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পাওয়ার পরও বিসিআইসি সার ডিলারদের পরিবহন খরচ বৃদ্ধি করা হয়নি। এছাড়া ব্যাংক সুদ, গুদাম ভাড়া, কর্মচারী ব্যয়, লোড-আনলোডসহ আনুষঙ্গিক খচর বৃদ্ধি পাওয়ার পরও ডিলারদের কমিশন বৃদ্ধি করা হয়নি। সার ডিলারদের ন্যায্য দাবি বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধি না করে সরকার সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালা পরিবর্তন করে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
সার পরিবেশকদের দাবি হচ্ছে, তড়িঘড়ি করে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা যাবে না। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করলে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণের বিদ্যমান নীতিমালা বহাল রাখা, প্রয়োজনীয় সার বরাদ্দ, কমিশন বাড়ানোসহ ৫ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচির পালিত হয়। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখা এ কর্মসচির আয়োজন করে। কর্মসূচিতে জেলার ৫ উপজেলার সার ডিলার ও সাব-ডিলাররা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শখার সভাপতি মোহাম্মদ আকবর হোসেন, সিনিয়র সহ-সভাপতি কাজী সেতাউর রহমান, সহ-সভাপতি দানিউল হক, নাজমুল হকসহ অন্যরা।
এ সময় বক্তারা বলেন, ২০০৯ সালের ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নীতিমালায় কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছে যাচ্ছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে কৃষকরা হাতে কাছেই সার পাচ্ছেন। নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে মাঠ পর্যায়ে সার বিতরণে বিশৃঙ্খালা তৈরী হবে এবং কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়াও যৌক্তিক কমিশন নির্ধারণ, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দের দাবি জানানো হয়। পরে একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়।


প্রকাশিত: October 20, 2025 | সময়: 2:14 am | সুমন শেখ

আরও খবর