সর্বশেষ সংবাদ :

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন

রকিবুল হাসান রকি, রাজশাহী :

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন উপাচার্য প্রফেসর সালেহ্ হাসান নকীব।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা থেকে ঘন্টাব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্যের লিখিত বক্তব্য জানানো হয়,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত উপ-উপাচার্যদ্বয়, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার, অনুষদ অধিকর্তাবৃন্দ, কলেজ পরিদর্শক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাব পরিচালক, ছাত্র-উপদেষ্টা, প্রক্টর, প্রাধ্যক্ষ, জনসংযোগ প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাগণ, প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ আপনাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা।

আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অপরাহ্নে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে যোগ দেই। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল ক্ষেত্রে অভাবনীয় শূন্যতা বিরাজ করছিল। দায়িত্বে যোগদানের মুহূর্ত থেকেই সেসব শূন্যতা পূরণ অনিবার্য হয়ে উঠে। সংশ্লিষ্ট সকলের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শে সে শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হয়। প্রক্টরিয়াল টিমের এবং স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এরপর প্রথমেই আসে জুলাই বিপ্লবকালে থমকে যাওয়া ক্লাস ও পরীক্ষা শুরু করা। অনুষদ অধিকর্তা, বিভাগীয় সভাপতি, ইনস্টিটিউট পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য, সর্বোপরি শিক্ষকবৃন্দের সহযোগিতায় তা সম্ভব হয়। সে সময় অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরীক্ষা সম্পন্ন করা ও ক্লাস শুরু করা হয়।

স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি সম্পন্ন করাও অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল। আমরা সম্ভব স্বল্প সময়ে তা সম্পন্ন করতে পেরেছি। প্রথমবারের মতো এবারই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুরে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এতে করে ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকদের বিড়ম্বনা লাঘব করা সম্ভব হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে নির্বাচনহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন সম্পন্ন করা। উপাচার্য হবার আগে থেকেই এই বিষয়ের প্রতি আমার মনোযোগ ছিল। আমি রাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করি। রাকসু’র গঠনতন্ত্র সময়োপযোগী করা হয়। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করে দেই। তাদের প্রচেষ্টায় সকল প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বর্তমানে রাকসু নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ বাঞ্ছনীয় যে, এই রাকসু নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত না হয় এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা বানচালের জন্য নানামুখী বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল। সৃষ্ট পরিস্থিতি ধৈর্য্যের সাথে মোকাবিলা করে আমরা অভিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। রাকসু নির্বাচন কমিশন সেই লক্ষ্যে যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তার জন্য আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন সম্পন্ন হবে ইনশাআল্লাহ। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমি সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা আশা করি।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময়ে অনুভব করেছি যে, মানসম্মত গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে প্রয়োজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি যেমন নিজ বিষয়ে পারদর্শী হবেন তেমনি পারিপার্শ্বিক চিন্তাচেতনায় হবেন আদর্শস্থানীয়। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে বিগত বছরগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ধারার নিদারুণ অভাব লক্ষিত হচ্ছিল। এরই এক পর্যায়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে সরকারের সিদ্ধান্তে সকল প্রকার নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ফলে শিক্ষক নিয়োগসহ অন্যান্য নিয়োগ সম্ভব হচ্ছিল না। শিক্ষকের অভাবে ক্লাস-পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছিল।

অচিরেই সে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এছাড়া মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের জন্য যুগোপযোগী যোগ্যতা নির্ধারণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। তার ভিত্তিতে বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিয়ে আসার চেষ্টা আমরা করছি। এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরিক্ষার একটা চর্চা শুরু হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোন কোন বিভাগে প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। লম্বা সময় নিয়ে মৌখিক যাচাই- বাছাই সম্ভব নয়। একটা ইনিশিয়াল স্ক্রিনিং প্রয়োজন। লিখিত পরিক্ষার মাধ্যমে এটা করার একটা চেষ্টা করা যায়। এই লিখিত পরিক্ষা যেনতেন প্রকারে হলে চলবে না। একটা উদাহরণ দিই, তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির একটি বিভাগের জন্য লিখিত পরীক্ষায় চারটি প্রশ্ন ছিল। একটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ইলেক্ট্রিক্যাল সার্কিটের জন্য ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন লেখা এবং তার সল্যুশন। একটি ছিল 4IR-এ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা কী ভূমিকা রাখতে পারে তার উপর। অন্য দুটো ছিল একেবারেই বেইসিক ট্রান্সমিশন/কমিউনিকেশন সিস্টেম সম্পর্কে। মোট নম্বর ৫০। এই ধরনের প্রশ্নে যারা ১৪/১৫ তুলতে পারবেন না, তাদের রেজাল্ট, পাবলিকেশন, ডিগ্রি যাই থাকুক না কেন, তাদের আমরা পরবর্তী ধাপের জন্য উপযুক্ত মনে করিনি।

 

লিখিত পরীক্ষা থেকে আমরা কতজন বাছাই করি? বিজ্ঞাপিত পদের মোটামুটি তিনগুন। তবে শেষ যে স্কোর বিবেচিত হয়, সেই স্কোর প্রাপ্ত সকলেই মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাক পান।

নির্বাচনী বোর্ডের সদস্যগণ একাধিক প্রশ্ন করেন, সেই প্রশ্নগুলো থেকে বোর্ডের সভাপতি প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশ্ন সিলেক্ট করেন। বোর্ডের পঞ্চম এবং শেষ সদস্য পরীক্ষার খাতায় কোডিং করেন। তিনি খাতার মুল্যায়নে অংশ নেন না। সংশ্লিষ্ট প্রশ্নকর্তাগণ প্রত্যেকে কোডিংকৃত উত্তরপত্রের কেবল তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরের মূল্যায়ন করেন। সবার নম্বর যোগ করে চূড়ান্ত নম্বর প্রস্তুত করা হয়।

মৌখিক পরীক্ষায় বিষয়ের বাইরে কোনো প্রশ্ন করা হয় না। কেবল বিষয়, থিসিস, পাবলিকেশন এই তিনটি হচ্ছে প্রশ্নের জায়গা। এর বাইরে কোনো আলাপ নেই। সময়ের কোন সীমা নেই, যাচাই করতে যতটুকু সময় নিতে হয়, আমরা নিই। মৌখিক পরীক্ষায় পাঁচজন বোর্ড মেম্বার যার যার মত মার্কিং করেন। মার্কিং-এর সময় কোনো ধরনের আলাপ আলোচনার সুযোগ নেই। সব শেষে লিখিত, মৌখিক, রেজাল্ট, উচ্চতর ডিগ্রি এবং পাবলিকেশন দেখে নিয়োগের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয় নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন দেনদরবার এবং লেনদেনকে সামনে রেখে দুটো পদের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে ছয়/সাতটি নিয়োগ দিয়ে। এমনটা বারবার হয়েছে। এটা আমরা করছি না। বরং যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে, বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত সংখ্যা আমরা পূর্ণ করছি না। চারটির জন্য বিজ্ঞাপন, চারজন ভালো ক্যান্ডিডেট পাওয়া না গেলে, তিনজন নেওয়া হবে। তিনজন পাওয়া না গেলে, দুজন। কাউকে পাওয়া না গেলে, কেউ নয়। সংখ্যা পূর্ণ করার কোনো দায় বর্তমান প্রশাসনের নেই।

আরেকটা কথা, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে, নিয়োগ প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত সেই সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। কিন্তু আমরা যে প্রেক্ষাপটে কাজ করি তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক ছাড়া স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করা যেতো। সেই সময় এখনো আসেনি। আপাতত আমাদের চেষ্টা, অযোগ্য একজনও যেন নিয়োগ না পায়। আমরা চেষ্টা করছি। কী করছি, কতটুকু করছি সেটা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

বর্তমান বিশ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন (রুয়া) নামে রাবি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিভিন্ন কারণে সংগঠনটি ততটা কার্যকর ছিল না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারেই আমরা সব বাধা উপেক্ষা করে রুয়া’র নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করি। সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কমিটি ৩ আগস্ট তারিখে এক অনাড়ম্বর আয়োজনে এই সিনেট ভবনে তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সূচনা হলো। আশা করি এই সংগঠন বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাসে বাধাহীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিবেশকে রক্ষার জন্য সচেতনতা ও অধিকতর দায়িত্বশীলতা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ব্যক্তিগত কিংবা দলীয়ভাবে সভা-সমাবেশে বক্তৃতা-বিবৃতি ও সামাজিক মাধ্যমে সর্বৈব অসত্য, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও দুরভিসন্ধিমূলক পরিসংখ্যান ও তথ্য, কুরুচিপূর্ণ শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দায়িত্বরতদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। এ জাতীয় মনগড়া ও উস্কানিমূলক বক্তব্য পরিহার করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। এটি পরিচালনা প্রশাসনের একার পক্ষে দুরূহ। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা। আগামী দিনগুলোতে আমরা সে সহযোগিতা পাব বলে আশা রাখি। আপনাদের গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শকে আমরা স্বাগত জানাই। এই বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায়, এখানে পঠন-পাঠনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা সকলের সহযোগিতা আশা করি।

সানশাইন /শামি


প্রকাশিত: September 4, 2025 | সময়: 5:13 pm | Daily Sunshine