সর্বশেষ সংবাদ :

জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতিতে অনুপস্থিত পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ

ইবতিদা ফেরদৌস: ২০২৪ সালের ৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা গণআন্দোলনের স্মরণে রাজশাহীর বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা হয়েছে বহু গ্রাফিতি। এসব গ্রাফিতিতে দেখা যাচ্ছে মূলত ছাত্রদের ছবি ও প্রতিবাদের প্রতীক। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের, নার্স-চিকিৎসকদের, পরিবহন শ্রমিক, সাধারণ জনতা ও স্থানীয় দোকানিদের কোনো চিত্র নেই সেখানে। সরেজমিনে নগরীর সাহেববাজার, ভদ্রা, উপশহর, বিনোদপুর, লক্ষ্মীপুরসহ অন্তত ৫০টি স্থানে আঁকা দেয়ালচিত্র পর্যবেক্ষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
শুধু একজন রিকশাচালকের ছবি পাওয়া যায় যিনি আন্দোলনের সময় আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং মিডিয়ায় এসেছিলেন। এর বাইরে অন্য কোনো শ্রেণি পেশার মানুষ গ্রাফিতিতে নেই বললেই চলে। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের সময় ছাত্রদের পাশাপাশি শিক্ষকরা তাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন, চিকিৎসক-নার্সরা আহতদের সেবা দিয়েছেন, পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন, দোকানদাররা পানি ও ওষুধ দিয়েছেন আন্দোলনকারীদের। তবে এসব অংশগ্রহণ বা ভূমিকা গ্রাফিতিতে অনুপস্থিত থাকা উচিৎ নয় বলে মত বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন আন্দোলনের চিত্রায়নে এই একপাক্ষিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিকৃত বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল বাশার বলেন, ছাত্ররা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল ঠিক, তবে একে একক গোষ্ঠীর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরলে আন্দোলনের সার্বিক চরিত্র হারায়। এটা ইতিহাসের অংশগ্রহণমূলক দিককে ধামাচাপা দেওয়ার মতো। ইতিহাস ও আন্দোলনের স্মারক নির্মাণে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের স্বীকৃতি থাকা দরকার। দেয়ালচিত্র, স্মারক, গণমাধ্যম বা পাঠ্যবই যেখানেই হোক, সবার অবদান তুলে ধরলেই আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। তরুণ চিত্রশিল্পী সামিহা জান্নাত বলেন, আমরা অনেক সময় প্রতীকি রূপ দিতে গিয়ে কেবল ছাত্রদের আঁকি। কিন্তু এটা করলে পুরো বাস্তবতা উঠে আসে না। শিল্পচর্চায় ভারসাম্য থাকা জরুরি।
গণআন্দোলনের তিন সপ্তাহে শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিক, দোকানি, নারীরা সরাসরি মাঠে ছিলেন বা পেছন থেকে সহায়তা করেছেন। ছাত্রদের বাহিরে অন্যান্য পেশাজীবীদের ভূমিকা ও ছিল অভূতপূর্ব। আন্দোলনের সময় রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন শহরের শিক্ষক, শিক্ষিকারা ছাত্রদের মিছিলে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে ও মৌন সমর্থন দেয়। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ছাত্রদের পক্ষে মুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানায়। এমনকি রাজশাহীতে সংঘর্ষের সময় আহত হন একাধিক পথচারী। এছাড়াও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় অনেক ছোট ছোট শিশুকে এবং কিছু সংখ্যক শিশু শহীদ হয় এই আন্দোলনের জের ধরে। এদিকে ডাক্তার নার্সরা পেছন থেকে আহত জনতাদের চিকিৎসার সেবা দিয়েছে। অনেকে প্রকাশ মিছিলে এসেও তাদের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালীন প্রায় ৫ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন তাদের অর্ধেকই ছাত্র নন।
রাজশাহীর একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বললেন, মিছিল শেষে আমরা ভিজে গিয়েছিলাম। আশপাশের দোকানিরা আমাদের গরম পানি দিয়েছে। এক চাচা নিজে গিয়ে ওষুধ কিনে এনেছিলেন। আজ এই দেয়ালে শুধু আমাদের ছবি, ওনাদের কিছু নেই!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দোকানি বলেন, আমাদের দোকানে ওরা বিশ্রাম করত। কেউ আহত হলে আমরাই আগে পানি দিতাম। শুধু ছাত্ররাই আন্দোলন করেছে এইটা বললে কষ্ট লাগে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দলনের অন্যতম সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, আন্দলনের পরে সকলে মিলে গ্রাফিতি গুলো করেছিল। সে সময় কাউকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি ফলে আমাদের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই বার বার গ্রাফিতির মাধ্যমে উঠে এসেছে। গ্রাফিতি গুলোতে শুধু ছাত্রদের ছবিই নেই এর সাথে আরো অনেকের ছবি আছে কিন্তু তা তুলনায় অনেক কম।


প্রকাশিত: July 31, 2025 | সময়: 2:44 am | সুমন শেখ