সর্বশেষ সংবাদ :

গোদাগাড়ীতে ১৬৫টি বিদ্যালয়ের ৮৩টিতে নেই প্রধান শিক্ষক

সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩১ হাজার ৮৩৯ জন। এর বিপরীতে রয়েছে ৯৩৯ জন শিক্ষকের পদ। প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক সংকটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উপজেলার ১৬৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। একইসঙ্গে সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার মানে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ না দিলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় উপজেলার দিয়াড় মাকিচক, হুনমন্ত নগর, চর নওশেরা ও আষাড়িয়াদহসহ চরের ৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এইসব বিদ্যালয়ে কয়েক বছর ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
চর দিয়াড় মাকিচক প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৭০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে চারজন শিক্ষক কর্মরত। পদ্মা নদীর ওপারে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া দিয়াড় মানিকচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন মাত্র পাঁচজন। অথচ স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মমিনুল ইসলামকে সম্প্রতি বদলি করা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ আকতার তিনি বলেন, নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব কাজই আমাকে সামলাতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় প্রতদিন পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজের জন্য যাওয়া-আসা করার ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তি অতিরিক্ত সময় অপচয় এবং শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির মুখোমুখি হতে হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, উপজেলায় ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের সংখ্যা ১৬৫টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮২ জন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ৮৩ টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৯৩৯ টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯২২ জন। অর্থাৎ ১৭টি সহকারী শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
তবে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপাতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সংকট বেশি প্রকট।
আষাড়িয়াদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক চন্দনা খাতুন বলেন, ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছি। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি ৪ জন শিক্ষক নিয়ে নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানও চালিয়ে যাচ্ছি। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও পড়ে। আমরা চেষ্টা করলেও তারা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা প্রয়োজন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির গোদাগাড়ী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ও ডোমকুলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর চাপ পড়ে বেশি। যে কারণে তারা ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঠিকভাবে পাঠদান করাতে পারেন না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি।
চর দিয়াড় মাকিচক গ্রামের অভিভাবক সামশুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের অফিসের কাজ বেশি থাকলে ক্লাসে তার প্রভাব পড়বেই। আমাদের সন্তানরা যেন লেখাপড়ায় পিছিয়ে না পড়ে সে জন্য দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ-সংরক্ষন কমেটির সভাপতি এ্যডভকেট সালাউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। শিক্ষার মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক প্রশাসনিক দায়িত্ব– সবকিছুই তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। প্রধান শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয় যেন মাঝিবিহীন নৌকা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুনমুন সুলতানা বলেন,শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের গ্রেডেশন তালিকা প্রস্ততের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করছি, খুব শীঘ্রই শূন্য প্রধান শিক্ষক পদগুলো পূরণের কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি-সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকায় পদোন্নতি কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে পদোন্নতি ও শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট প্রকট হয়েছে।


প্রকাশিত: November 5, 2026 | সময়: 5:54 am | সুমন শেখ

আরও খবর