, , ।
আক্কেলপুর প্রতিনিধি: দীর্ঘ ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ রেলস্টেশন। ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে জামালগঞ্জ স্টেশন পুনরায় চালুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান পদায়নের কার্যক্রম চলমান থাকায় স্টেশনটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার কার্যালয়।
এর আগে জামালগঞ্জ রেলস্টেশন চালুর দাবিতে ‘ক্লোজিং ডাউন প্রত্যাহার সমন্বয় পরিষদ’ স্টেশনটি চালুর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী ১ নভেম্বর থেকে শাটডাউন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে জামালগঞ্জ স্টেশনের ওপর দিয়ে কোনো ট্রেন চলাচল করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিলেন। যেহেতু স্টেশনটি চালুর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে তাহলে কর্মসূচীর আর প্রয়োজন হবে না বলে জানান তারা।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, অপারেটিং কর্মচারী, স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের সংকটে পাকশী বিভাগে বর্তমানে ৫৬টি স্টেশনের অপারেটিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব স্টেশন বন্ধ থাকায় ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ট্রেন পরিচালনা ও অপারেটিং কার্যক্রমের সুবিধার্থে বন্ধ স্টেশনগুলো পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।
চিঠি অনুযায়ী, জনবলসংকটের কারণে ২০১০ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে জামালগঞ্জ স্টেশনের অপারেটিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান পদায়নের কার্যক্রম চলমান হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্টেশনটি সচল করতে লুপলাইন ফিটিংস, সিগন্যালিং সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক ফিটিংস কার্যকর করা জরুরি। এসব কাজ সম্পন্ন করে স্টেশনটি পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রেলওয়ের চিঠিতে স্টেশনটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হলেও কবে নাগাদ পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে রেল স্টেশনটি পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয়রা ১১ সদস্য বিশিষ্ট ‘ক্লোজিং ডাউন প্রত্যাহার সমন্বয় পর্ষদ’ গঠন করেছিলেন। তারা রেল স্টেশনটি চালু করতে জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রি আব্দুল বারি’র কাছ থেকে ডিও লেটার নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেলেন। এরপরই পুনরায় চালুর চিঠি জারি করে রেলওয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামালগঞ্জ স্টেশনটি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টেশনটি থেকে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে দূরত্ব তিন থেকে চার কিলোমিটার। স্টেশনটি পুরোপুরি সচল হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের এ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের রেলযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া জামালগঞ্জ কলা ও কাঁচামালের জন্য বিখ্যাত। স্টেশনটি চালু হলে কলা ও কাঁচামাল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা সহজ হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত তিন-চার বছর ধরে জামালগঞ্জ স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামানো হয় না। বর্তমানে রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর তিতুমীর এক্সপ্রেস এবং খুলনা থেকে আসা পার্বতীপুরগামী লোকাল রকেট মেইল ২ নম্বর লাইনে যাত্রাবিরতি করে। ওই লাইনে প্ল্যাটফর্ম না থাকায় যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠানামা করতে হয়। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন বলে জানান স্থানীয়রা।
জামালগঞ্জের বাসিন্দা জাহেদুল আলম হিটো বলেন, ব্রিটিশ আমলে রেললাইন স্থাপনের সময় থেকেই জামালগঞ্জ রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত। শুরুতে বিভিন্ন ট্রেন এখানে থামত। কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষকে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামালগঞ্জ স্টেশন বন্ধ করার পাশাপাশি গরীবের ট্রেন খ্যাত লোকাল উত্তরা মেইল ট্রেনটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জাহেদুল আলম আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রি আব্দুল বারির সহযোগিতায় তাঁরা স্টেশনটি চালুর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে স্টেশনটির ক্লোজিং ডাউন প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়ায় তাঁরা আনন্দিত।
জামালগঞ্জ রেলস্টেশন ক্লোজিং ডাউন প্রত্যাহার সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক বাবু সওদাগর বলেন, পাকিস্তান-পূর্ব সময়ে এ স্টেশনে দার্জিলিং মেইল, আসাম মেইলসহ বিভিন্ন ট্রেন যাত্রাবিরতি করত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে স্টেশনটি গুরুত্বপূর্ণ। রেলওয়ে থেকে স্টেশনটি পুনরায় চালুর বিষয়ে চিঠি পাওয়া গেছে। তাই ঘোষিত শাটডাউন কর্মসূচির আর প্রয়োজন হবে না বলে তাঁরা আশা করছেন।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জামালগঞ্জ রেলস্টেশনটি পুনরায় চালুর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্টেশনটির লুপলাইন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক ফিটিংসসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয় পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কারিগরি কাজ সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার পর স্টেশনটি চালুর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।