সর্বশেষ সংবাদ :

২২ হাজার টন গম উৎপাদনের পরও গুদাম শুন্য: চার বছরে এক ছটাক গমও কিনতে পারেনি খাদ্যবিভাগ

অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম: নাটোরের বড়াইগ্রামে সরকারি খাদ্য গুদামে ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে চলতি মৌসুমের সরকারি গম সংগ্রহ অভিযান। কিন্তু পুরো ক্রয় মওসুমে এক ছটাক গমও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। গত বছরের চেয়ে কেজিতে ২ টাকা বাড়িয়ে এবার কেজি প্রতি ৩৬ টাকা দর নির্ধারণ করা হলেও জটিল নিয়মনীতি ও খোলাবাজারের চেয়ে খাদ্যগুদামে দাম কম হওয়ার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষিরা।
শুধু এবারই নয়, ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও গম সংগ্রহের চিত্র ছিল একই রকম। খোলাবাজারের সাথে সরকারি দরের তারতম্যের কারণে এ সময়ে এক কেজি গমও কিনতে পারেনি গুদামের কর্মকর্তারা। ফলে টানা চার বছর ধরে বড়াইগ্রামে সরকারি গম সংগ্রহের ঝুলি শূন্যতেই আটকে রয়েছে।
উপজেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, গত ৩ মে থেকে গম ক্রয় মৌসুমে ৮২০ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কেনাবেচা শুরু হয়। এ বছর উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার কৃষক ৪ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে গমের সফল চাষাবাদ করেছেন, যেখানে উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার ৭৯০ টন। বিপুল এ উৎপাদনের বিপরীতে সরকারি গুদামে এক ছটাক গমও না আসা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ গমের ক্ষেত্রে ভরাডুবি হলেও ৫শ’ টন বোরো ধান ও ৯ হাজার ২৩৮ চন চাল সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই শতভাগ অর্জিত হয়েছে।
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুদামে গম না আসার পেছনে প্রধান কারণ সরকারি শর্তের জটিলতা ও বাজারদর। বর্তমানে উন্মুক্ত বাজারে প্রতি মণ গম বিক্রি হচ্ছে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকায়, যা সরকারি দরের চেয়ে মণপ্রতি অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি। তাছাড়া গুদামে বিক্রি করতে গেলে আর্দ্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে। অপরদিকে, বাজারে ১৮ শতাংশ আর্দ্রতা থাকলেও ব্যবসায়ীরা অনায়াসে গম কিনে নিচ্ছেন।
চাষিদের অভিযোগ, গুদামে গম নিয়ে গেলে গাড়ি ভাড়া, কুলি খরচ ও পরিমাপের ঝামেলার পেছনে মণপ্রতি আরও বাড়তি ৫০-৬০ টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই লোকসান এবং হয়রানি এড়াতে সাধারণ কৃষকরা খোলা বাজারেই শস্য বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মাঝগাঁও এলাকার গমচাষি আবুল হোসেন বলেন, বাজারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভাল দামে নগদ টাকায় বিক্রি করা যায়। গুদামে যদি বাজারের চেয়ে মণপ্রতি এক-দেড়শ টাকা বাড়তি দাম দেওয়া হতো, তবে কৃষকরা অবশ্যই সরকারি গুদামে যেতেন। উপজেলার চকপাড়া এলাকার গম ব্যবসায়ী লালন হোসেন জানান, এক দেড় মাস আগেও যখন বাজারে গমের দাম মণপ্রতি এক হাজার ৪০০ টাকা ছিল, খাদ্য বিভাগ চাইলে তখনই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের উদ্যোগ নিতে পারত।
খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা পারভীন বিথী বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রতি কেজি গমের নির্ধারিত দাম ৩৬ টাকা, যা খোলাবাজারের চেয়ে ৫-৬ টাকা কম। তাই কৃষকেরা গুদামে গম দেননি।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী ডালিম বলেন, সরকারি দরের চেয়ে খোলাবাজারে দাম বেশি পাওয়ায় চাষীরা গুদামে গম বিক্রি করেননি। তবে অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমে সফলভাবে ৩৬৭ জন নিবন্ধিত কৃষকের মধ্যে ১৬৭ জনের কাছ থেকে ধান এবং চুক্তিবদ্ধ আটটি অটোমিল এবং ২২টি হাস্কিং মিল থেকে চাল সংগ্রহ শতভাগ সম্পন্ন করা হয়েছে।
উপজেলা গম, ধান ও চাল সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, টানা চার বছর ধরে উপজেলায় গম সংগ্রহের এ ব্যর্থতা ও বাজারের প্রকৃত চিত্রসহ আগামীতে বাস্তবসম্মত দর নির্ধারণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।


প্রকাশিত: September 6, 2026 | সময়: 3:45 am | সুমন শেখ

আরও খবর