সর্বশেষ সংবাদ :

বাঘায় বিদ্যুতের হাহাকার, ১২ ঘণ্টাই লোডশেডিং, বিল নিয়ে ক্ষোভ !

স্টাফ রিপোর্টার,বাঘা :
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে কমবেশি একই চিত্র। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঘন-ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না, বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এর মধ্যে বিদ্যুতের বিলও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না পাওয়া, অন্যদিকে বাড়তি বিল-দুইয়ে মিলে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক হারে ক্ষোভ বাড়ছে।

 

 

বিদ্যুতের এমন সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী-সহ সর্বস্তরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কৃষিকাজেও এর প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

 

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাঘা সদর ও পৌর সভাকেন্দ্রিক এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক একটু কম। তবে সাত ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশ নাজুক। দিনের পাশা-পাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।

 

 

বাঘা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মনিরুজ্জামান বলেন, বাঘা ও আড়ানী পৌরসভা-সহ সাত ইউনিয়ন মিলে অত্র এলাকায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু আমরা রাতে ১০ মেগাওয়াট এবং দিনে মাত্র ৭ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছি। ফলে বাধ্য হয়ে পর্যায়ক্রমে এক লাইন চালু রেখে অন্য লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়ার কারনে জনগণ জনদুর্ভোগে রয়েছেন।

লোকজন জানান, পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হচ্ছে। এসব আপডেটে সরবরাহ ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ের কথা জানানো হচ্ছে। তবে লোকজনের অভিযোগ, একদিকে বিদ্যুৎ ঠিক মতো সরবরহা করতে পারছেনা, অন্য দিকে বিল আসছে পূর্বের চেয়ে দ্বিগুন। এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তারা আরো অভিযোগ করেন, শহর এবং গ্রাম কেন্দ্রীক বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষম বন্টন নিয়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ আসার পরও অনেক সময় স্থায়ী হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘরের কাজ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য-সব কিছুতেই বিঘ্ন ঘটছে। গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

 

অপরদিকে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুতের অনিয়মিত লোড সরবরাহের কারণে সেচব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে সেচ দেওয়া কৃষকদের বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এতে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাঘার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক মহাসিন আলী বলেন, বিদ্যুৎ কখন আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। মোটর চালানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি এমনি ভাবে চলতে থাকে তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে।

 

 

অনুরুপ ভাবে গ্রামের ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও ক্ষুদ্র কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ সময় রাইস মিল বন্ধ থাকছে। আর ফার্মে ছট-ফট করছে বয়লার মুরগী। কেউ কেউ অতিরিক্ত খরচ করে জেনারেটর বা অন্য বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করছেন।

বাড়তি বিলেও ক্ষোভ :
লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ, আগের তুলনায় বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে। অথচ নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেয়ে দিনের বড় একটি সময় অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে বিল বাড়ছে কেন ? গ্রাহকদের অভিযোগ, একদিকে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং, অন্যদিকে বাড়তি বিলের চাপ তাদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শহর-গ্রামে ব্যবধান :
এদিকে রাজশাহী শহর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তুলনামূলক কম। রাজশাহী শহরের একজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় এক ঘণ্টা এবং রাতে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে একই জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাঘার বাসিন্দারা। তাদের দাবি, সরবরাহ সংকট থাকলে লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে সব এলাকার মানুষের জন্য সুষম ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সদর ও পৌরসভা এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রাম গুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎ এখন আর শুধু আলো বা গৃহস্থালির প্রয়োজন নয়। কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এর প্রভাব পড়ছে মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রায়।

সচেতন মহলের মতে, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও সুষম লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুতের বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাঘার সাত ইউনিয়নের মানুষের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে তোলার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য দূর করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের বিলের বিষয়ে গ্রাহকদের অভিযোগেরও সুরাহা করতে হবে।

নুরুজ্জামান /শামি


প্রকাশিত: August 8, 2026 | সময়: 10:26 pm | Daily Sunshine