শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
কালাই প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ধান বিক্রির সময় প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ কেজি ‘ধলতা’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আড়তদারের বিরুদ্ধে। এনিয়ে প্রতিদিন কৃষকদের সাথে আড়ৎদারদের দ্বন্দ্ব লেগেই আছে।
অনেক সময় কৃষক-আড়ৎদারের মধ্যে মারপিটের ঘটনাও ঘটছে। সরকার নির্ধারিত যে কোনো পণ্যর ৪০ কেজিতে এক মণ হিসেব ধরা হলেও ধান বিক্রি করতে এসে কৃষকদের মণ পুরাতে ৪২ থেকে ৪৩ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
ফলে কঠোর পরিশ্রমের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে কাঙ্খিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা। বরং প্রতিমণে ২-৩ কেজি করে বাড়তি ধান দিতে গিয়ে হাজার হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। সকালে আড়ৎদাররা যে দামে ধান ক্রয় করেন, বিকেলে সেই দামেই ধানগুলো মহাজনদের ঘরে বিক্রি করে দেন। তারপরও তারা প্রতিমণে লাভ করে আসছেন। এভাবেই আড়ৎদাররা ধলতা নামে কৃষকের ধান হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তবে আড়ৎদাররা বলছেন ভিন্ন কথা, কাঁচা ধান,বাড়ি থেকে হাটে নিয়ে আসতেই অনেকটা শুকিয়ে যায়, ওজনে কম হয়। সে কারনে ২ থেকে ৩ কেজি বেশী নেওয়া হচ্ছে।এটাকে ধলতা বলে না।
বৃহস্পতিবার ১৮ জুন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পাঁচশিরা বাজার, মাত্রাই বাজার, পুনট বাজার, মোলামগাড়ী হাট ও আহম্মেদাবাসহ ধান বিক্রির সময় আড়তদাররা কাঁচা বলে ওজনে কম হবে, এমন অজুহাতে প্রতি মণে শুকনা ও কাঁচা উভয়ের নিকট থেকে অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ কেজি করে ধান নিচ্ছেন। আবার দুই মণের বস্তায় ৫ থেকে ৬ কেজি পর্যন্ত বাড়তি ধান রেখে দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধানের আর্দ্রতা, শুকানোর পর ওজন কম হওয়া এমনকি পাটের বস্তার ওজনের অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ধান নিচ্ছেন। অনেকে ধলতার ধান দিতে অনাগ্রহ দেখালে ঘরের ভিতরে বস্তা খুলে ঢেলে নেওয়ার ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকের সাথে আড়ৎদারের লোকজনদের মারপিটের ঘটনাও ঘটছে। এসবের কারণে কৃষকদের তোপের মুখে পরে আড়ৎদাররা অনেক সময় ধান ক্রয় বন্ধও রাখছে। ধলতার বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ না করলেই আবার ধান ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ অতিরিক্ত ধান নেওয়া হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের কৃষক রাশিদুল আলম ‘আমরা সাধারণ কৃষক রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু ধানের ন্যায্যমূল্য পাই না। উল্টো প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ধলতা দিতে হয়, এতে আমাদের লোকসান আরও বেড়ে যায়। এবং কৃষকের কষ্টের কথা কেউ ভাবে না। তিনি আরও বলেন পাঁচবিঘা জমিতে এবার বোরো চাষ করতে তার প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে।
এরমধ্যে কয়েকদিনের ঝড়ে প্রায় দুইবিঘা জমির ধানগাছ মাটিতে শুয়ে গেছে। ফলণও কম হচ্ছে। তার ওপর ধান বাজারে বিক্রি করতে এসে আরও বিপাকে পড়েছেন।আজ ২৫ বস্তা ধান বিক্রি করতে আসছি। দুইমণ ওজনের প্রতি বস্তায় ৮৫ কেজি করে এনেছি। এখন ৮৮ কেজির কম নিবেনা। না দিলে ধান নিতে চাচ্ছেনা। ৫০ মণ ধানের ওপর ২০০ কেজি ধান বেশি দিতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে।
উপজেলার আরেক কৃষক কামিরুল বলেন, এক মৌসুমে ধলতার নামে ১০-১২ মণ ধান বেশি চলে যায়। এত কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু বিক্রির সময় একপ্রকার জিম্মি হয়েই ধান দিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবাদ করলেই ব্যবসায়ীরা বলে, অন্য হাটে নিয়ে যান। তখন তো আরও বিপদে পরতে হয়। কারন সব হাটেরই একই চিত্র।অধিকাংশ হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে এক ধরনের অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা সমন্বয় করেই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার এই নিয়ম চালু করেছে। তাদের তো আর লোকশান গুনতে হচ্ছেনা। কারন যে দামে কৃষকদের নিকট থেকে ধান ক্রয় করছেন আবার সেই দামেই তারা মহাজনদের ঘরে ধান বিক্রি করছেন। ধলতার ধানই তাদের লাভ হচ্ছে। এতে আড়ৎদার-মহাজন দুইপক্ষই খুশি। কৃষকেরা মুখ বুজে ক্ষতি মেনে নিচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে অন্য আড়তে গিয়েও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কৃষকদের।
এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন ধানে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শুকানোর পর ওজন কমে যায়। তাই কিছু অতিরিক্ত ধান নেওয়া হয়। আড়ৎদার এনামুল হক বলেন, ধান শুকানোর পর প্রতি বস্তায় ২-৩ কেজি ওজন কমে যায়। তাই আগে থেকেই কিছু বাড়তি নিতে হয়। এটা যে আজকের নিয়ম তা নয়, আগে থেকেই এই নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ হারুনুর রশিদ বলেন, সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু বাজারে ওজন কারচুপি ও ‘ধলতা’র নামে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার মতো অনিয়ম চলতে থাকলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় বাজার মনিটরিং ও সঠিক ওজন নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, নির্ধারিত ওজনের বাইরে পণ্য নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করার কথাও জানান তিনি।