, , ।
স্পোর্টস ডেস্ক: একটা সময় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে মাতিয়ে রাখতো কেবলই ফুটবল। মাঠে মাঠে উন্মাদনা, গ্যালারিতে হইচই, সবকিছুই ফুটবলের দখলে। ক্রিকেট তখন ছিল অনেকটা আড়ালে, যেন নিজের জায়গা খুঁজে ফেরার অপেক্ষায়।
১৯৯৪ সালে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিব্রতকর পরিস্থিতির মাঝে পড়ে যান ক্রিকেট সংগঠক থেকে শুরু করে ক্রিকেটাররাও। সেই অবস্থার আমূল পরিবর্তনটা ঘটে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর। ক্রিকেটের নবজাগরণের মূল ভিতটাই স্থাপন করে দেয় এই ট্রফি। এর ধারাবাহিকতাতেই বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলে এবং ২০০০ সালে ২৬ জুন ৯টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ভোটে টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত ক্লাবে দশম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
অবশ্য সেদিনকার ঐতিহাসিক সেই জয় মোটেও সহজ ছিল না। পাহাড়সম চাপ নিয়ে কুয়ালালামপুরে কেনিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। নেতৃত্বে ছিলেন আকরাম খান। বৃষ্টির কারণে ফাইনাল ম্যাচটি গড়িয়েছে দুই দিনে। বাংলাদেশের জয়ের জন্য ১ বলে প্রয়োজন ছিল ১ রান। এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে তখন হাসিবুল হোসেন শান্ত। মার্টিন সুজি সেদিন শান্তকে আটকাত পারেননি। প্রয়োজনীয় রান নিয়েই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে লাল-সবুজের দেশ।
গতকাল আইসিসি ট্রফি জয়ের ২৯ বছর পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম অর্জন সেই ট্রফি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। আইসিসি ট্রফি জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। ফাইনালের আগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অধিনায়কোচিত ৬৮ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। ওই ইনিংসটিকে আইসিসি ট্রফি জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হিসেবে দেখা হয়।
ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আইসিসি ট্রফি জয়ের অধিনায়ক আকরাম বাংলানিউজকে বলেছেন, ‘আমাদের ভালো সুযোগ এসেছিল ১৯৯৪ সালে। দলটাও ভালো ছিল। কিন্তু আমরা পারিনি। সব মিলিয়ে ক্রিকেট নিয়ে সবার মধ্যেই হতাশা চলে এসেছিল। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি আমাদের জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। শেষ সুযোগের মতো আর কী। সেখানে ভালো না করলে হয়তো বাংলাদেশ থেকে ক্রিকেটটাই উঠে যেতো! তবে আমরা শেষ পর্যন্ত কোয়ালিফাই করে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করি। আমি মনে করি, আমাদের ক্রিকেট এই পর্যায়ে আসার পেছনে এই ট্রফির ভূমিকা অনেক। আমার কাছে এই অর্জন অনন্য।’
আকরাম খান দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন ঠিকই, তবে ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ে বড় ভূমিকা ছিল হাসিবুল হোসেন শান্তরও। শেষ ওভারের সেই চাপের মুহূর্তে ক্রিজে ছিলেন তিনি, সঙ্গে খালেদ মাসুদ পাইলট। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১১ রান। সেই চাপ সামলে পাইলটই ব্যবধানটা অনেকটাই কমিয়ে আনেন। শেষ মুহূর্তে সমীকরণ দাঁড়ায় ১ বলে ১ রান। ঠিক তখনই ইতিহাসের সবচেয়ে চাপের এক বলের সামনে দাঁড়িয়ে যান শান্ত।
২৯ বছর আগের সেই কঠিন মুহূর্ত স্মরণ করে শান্ত বলেন, ‘শেষ বলে যখন ১ রান লাগতো, তখন পাইলট আমাকে বললো, ব্যাটে লাগুক আর না লাগুক, দৌড় হবে কেবল। তখন আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম, যাই করি আউট হওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত জিততে পেরেছি। এই অনুভূতিটা আসলে বোঝানো যাবে না। এত বছর পরও যখন এই দিনটিতে আপনাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হই, অনুভূতিটা সত্যিই অন্য রকম।’
এদিকে খালেদ মাসুদ পাইলট ঐতিহাসিক এই দিনটির ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘২৯ বছর আগের ১৩ই এপ্রিল, আজকের এই দিনটা। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে কেনিয়ার বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক জয়! আমি গর্বিত, কারণ আমি ছিলাম সেই দলের একজন সদস্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলাম দেশকে গর্বিত করার স্বপ্ন নিয়ে।’
এরপর পাইলট আরও যোগ করেছেন, ‘আজও চোখে ভাসে জয়ের পর মাঠের উল্লাস, দেশের কোটি মানুষের ভালোবাসায় ভেসে যাওয়ার অনুভূতি, আর দেশে ফিরে পাওয়া সেই অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা। সেই মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে…আর যারা শুরু থেকেই আমাদের পাশে ছিলেন, আজও যারা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে হৃদয়ে ধারণ করেন; আপনাদের প্রতি রইলো আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। দোয়া করবেন, আমরা যেন সবসময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে নিজেদের সেরাটা দিতে পারি।’