, , ।
স্টাফ রিপোর্টার, জয়পুরহাট: শত বর্ষের ঐতিহ্যকে ধারন করে জয়পুরহাটের কালাইয়ে এবারও জমে উঠেছে জামাইদের মাছের মেলা। উপজেলার পাঁচশিরা বাজারে জামাইদের এই মাছের মেলায় এবার গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি জামাইদের আগমন ঘটেছে।
মঙ্গলবার ছিল অগ্রহায়নের প্রথম দিন অর্থাৎ নবান্ন উৎসব। অগ্রহায়ণের প্রথম প্রহর। চারদিক জুড়ে ভোরের কুয়াশা, সেই কুয়াশা ভেদ করে পূর্ব আকাশে উঁকি দিচ্ছে সোনালি রোদ। এরই মাঝে হিমেল বাতাস উপেক্ষা করে পাঁচশিরা বাজারমুখী মানুষের ঢল। কারণ আজ নবান্ন উৎসব।
আর এই উৎসবকে ঘিরে গত ১০৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী পাঁচশিরা বাজারের মাছের মেলা। জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও মানুষ এই দিনের অপেক্ষায় থাকে সারা বছর জুড়ে। এ মেলায় ‘কার জামাই সবচেয়ে বড় মাছ কিনতে পারে’ এই নিয়ে জামাইদের মধ্যে চলে তুমুল প্রতিযোগিতা। মেয়ে-জামাই, বিয়াই-বিয়ান, স্বজন ও গ্রামবাসী সবাই এই দিনে একমাত্র আকর্ষণের টাটকা দেশীয় মাছের মেলা থেকে কেনে মাছ।
জানা যায়, পুঁথিগত পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর অগ্রহায়ণের প্রথম দিনে, নতুন ধান ওঠার আনন্দে, গ্রামবাংলার কৃষকেরা আয়োজন করেন নবান্ন উৎসব। নতুন চালের পায়েস, পিঠা-পুলি, ক্ষীর, খই আর মুড়ির ঘ্র্যান ছড়িয়ে পড়ে বাড়ি থেকে বাড়িতে। আর তারই অন্যতম উৎসব আয়োজন হিসেবে কালাই পৌর শহরের পাঁচশিরা বাজারে বিগত ১০৫ বছর ধরে বসে আসছে এই মাছের মেলা। ভোর ৪ টা থেকেই শুরু হওয়া মেলায় ভিড় জমে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, চিতল, বাঘাইর সহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ দেখতে ও কিনতে। প্রতিটি দোকানের সামনে থাকে জমজমাট আলোচনা জমে উঠে, কোন মাছ কত কেজি, দাম কত, আর কোন মাছটা জামাই নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি।
এ মেলার ইতিহাস শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। এলাকার প্রবীণরা বলেন, কৃষকের ঘরে সদ্য কাটা ধানের নতুন চাল দিয়ে প্রথম রান্নার দিনেই শুরু হয় এই উৎসব। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা স্বজনদের এই দিনে আমন্ত্রণ করা হয় ঘরে ফিরে আসার। ফলে পাড়া-মহল্লায় সৃষ্টি হয় উৎসবের এক আলাদা আমেজ। আর মেলার জন্য স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত থাকেন কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই। তারা বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে মেলায় তোলেন, আর আশপাশের এলাকায় মাইকিং করে জানান দেন মেলার আগমনী বার্তা।
এবারের মেলায় বেশ কিছু বিশাল আকৃতির মাছ নজর কেড়েছে সবার। ৩৫ কেজি ওজনের একটি সিলভার কার্প বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার টাকায়, আর ১৯ কেজির কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। ছোট-বড় মিলে তিন কেজি থেকে শুরু করে ৩০ কেজিরও বেশি ওজনের নানা ধরনের মাছের সমাগমে মেলা যেন রূপ নিয়েছে উৎসবের রঙিন প্রদর্শনীতে। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতার সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কম, তবুও মেলা ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাসে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।
মাছ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ জানালেন, বড় সাইজের কাতলা, রুই, মৃগেল বিক্রি হচ্ছে ৭শত থেকে ১৫ শত টাকা কেজিতে, আর বাঘাইর ও চিতলের দাম উঠেছে ১৩ শত টাকা থেকে ২ হাজার টাকার ঘরে। মাঝারি সাইজের মাছও বিক্রি হচ্ছে ৩-৪ শত টাকা কেজি দরে। তবে মেলা শেষেও যদি মাছ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তাদের লোকসানের আশঙ্কা আছে। এ নিয়েই এখন দুশ্চিন্তা।
তবে মেলার আনন্দের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো শ্বশুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে আসা জামাইদের আগমন। বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকে আসা জামাই মিজানুর রহমান ১২ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ কিনেছেন। তার মতে, দাম একটু বেশি হলেও নবান্নের এই আনন্দে মাছ কেনা একরকম বাধ্যতামূলকই বলা যায়। তাই দাম নিয়ে ভাবতে নেই। মুলগ্রাম মহল্লার সতেন চন্দ্র বর্মণ প্রায় ৪৪ হাজার টাকায় দুটি বড় মাছ কিনে হাসিমুখে জানান, বাড়ির নাতি-নাতনিরা মাছ দেখে খুশিতে উল্লাস করবে এই আনন্দই সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
কালাই হাট ইজারাদার আলিম সরকার বলেন, এই মেলার কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই, লোকজন নিজেরাই এসে মেলাকে জীবন্ত করে তোলে। বছরের ওই একদিন পাঁচশিরা বাজার না সাজালেও নিজে থেকেই সাজিয়ে তোলে সাধারণ মানুষ। ক্রয়-বিক্রয়ের ধুমে বাজার মুখর থাকে সকাল থেকে দুপুর, কখনো কখনো আরও দীর্ঘ সময়। এ বছর মাছের আমদানি আগের বছরের তুলনায় এবারে বেশি বলে জানান তিনি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তৌহিদা মোহতামিম বলেন, মেলায় বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ ওঠায় স্থানীয় চাষীদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে। তার ধারণা, একদিনেই অন্তত এক কোটি টাকার মাছ বিক্রি হবে। চাষীদের মাছ চাষে উৎসাহিত করতে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে মৎস্য বিভাগ।