, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। এই উৎসবকে ঘিরে প্রতিমা তৈরিতে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। অভিজ্ঞ হাতের জাদুতে সূক্ষ্মভাবে গড়ে তুলছেন দেব-দেবীকে। দেবী দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী-সরস্বতীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিমা তৈরি করছেন তারা। তবে এখনো তুলিল আঁচড় পড়েনি। মন্দিরে মন্দিরে পুরোদস্তুর চলছে প্রতিমার কাঠামো ও অবয়ব তৈরির কাজ। কয়েক দিন পরই দুর্গাপূজা শুরু। ফলে দম ফেলার ফুরসত নেই মৃৎশিল্পীদের।
একদিকে প্রতিমা শিল্পীরা যেমন প্রতিমা তৈরীতে ব্যস্ত তেমনি মন্দির বা প্রতিমা স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট মন্ডপে ডেকোরেশন নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন পূজা উদযাপন কমিটির ব্যক্তিবর্গ। রাজশাহীতে শারদীয় দুর্গাপূজা এবার জেলাজুড়ে মোট ৪৬২টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ৩৮২টি মণ্ডপ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় এবং মহানগরে হবে ৮০টি মণ্ডপ।
যারমধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলায় ৪২টি, তানোর উপজেলায় ৫৮টি, পবা উপজেলায় ২২টি, মোহনপুর উপজেলায় ২৩টি, বাগমারা উপজেলায় ৮৩টি, পুঠিয়া উপজেলায় ৫৩টি, দুর্গাপুর উপজেলায় ১৮টি, চারঘাট উপজেলায় ৩৮টি ও বাঘা উপজেলায় ৪৬টি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পূজা শুরু হবে।
ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমাশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিমা সাজসজ্জায় আনা হচ্ছে নানান বৈচিত্র্য। কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও আবার আধুনিকতার ছোঁয়া।
সরোজমিন বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের কেউ কেউ প্রতিমা তৈরির প্রাথমিক উপকরণ এক করে খড়কুটোর মাপকাঠি করছেন, কেউবা প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার খড়কুটো ও মাটির কাজ পুরোটাই করে ফেলেছেন। এখন শুধু রং-তুলির আঁচড়, পোশাক পরানো ও অলংকার দেয়া বাকি। তারা জানিয়েছেন, এ কাজে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা করে কাটছে তাদের।
প্রতিমা শিল্পীরা বলছেন, আগের চেয়ে কাজ বেড়েছে, আবার খরচও বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় বাড়েনি পারিশ্রমিক। প্রতিমা তৈরির উপকরণের দামও চড়া। উপকরণ হিসেবে এঁটেল মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, সুতলি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গত বছরের চেয়ে এবার বেশি দাম গুনতে হচ্ছে তাদের।
নগরীর শেকের চকের প্রতিমা তৈরি করছিলেন কার্তিক চন্দ্র পাল (৪২) নামে একজন মৃৎশিল্প। তিনি জানালেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছি। শৈশব থেকে জীবন-যৌবন সব এর মধ্যেই কেটেছে। দেবী দুর্গা, গণেশ, কার্তিক সবাইকে তৈরি করা রপ্ত করেছি। বাবা আর বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ছোটবেলায় এই কাজ শিখেছি।
তিনি আরো বলেন, শুরুতে জীবিকার তাগিদে প্রতিমা তৈরি করলেও পরে ভালোবাসা আর ভালো লাগা থেকেই এ পেশায় থেকে যাওয়া। আজকাল এ পেশায় থেকে জীবিকা অর্জন সম্ভব নয়। দেব- দেবী তৈরী আমার স্বপ্ন-গৌরব ও অহংকার। কারণ এ পেশায় যে মজুরি পাওয়া যায় তা পরিশ্রমের তুলনায় খুবই কম। এছাড়া সব সময় কাজ থাকে না। পুজোর সময় হলেই প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা বাড়ে। তখন খুবই ভাল লাগে। আমি একজন শিল্পী-তার স্বীকৃতি পায়। বাকি সময় প্রতিমা-শিল্পীদের তেমন কদর থাকে না।
প্রতিমা তৈরিতে খরচ বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সুতলি, কাঠ, খড়, বাঁশ, মাটি সবকিছুর দাম বেড়েছে। এজন্য প্রতিমারও দাম বেড়েছে। আগে যে প্রতিমা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, খরচ বাড়ায় এখন সেটা ১৪-১৫ হাজার টাকা বিক্রি করা লাগছে। তার সাথে প্রতিমা তৈরীতে আরো পাঁচজন শিল্পী কাজ করছেন। এরা হলেন সুরঞ্জন পাল, বিকাশ পাল, গৌতম পাল, দুলাল পাল, সুসেন পাল।
মৃৎশিল্পী সুরঞ্জন পাল বলেন, বংশপরম্পরায় আমি এই মৃৎশিল্পের কারিগর। আমার পূর্ব পুরুষরা একই কাজ করে গেছেন। অন্য কোনও কাজ আমার জানা নেই। ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। পরিবারের জন্য তেমন কিছু করতে পারেনি। আগে যে মজুরি পেতাম তা দিয়ে মোটামুটি সংসার চলতো। তখন জিনিসপত্রের দাম কম ছিল। এখন দৈনিক ৬০০ টাকা করে মজুরি পাই, তবু সংসার চালাতে হিমশিম খাই।
তিনি আরও বলেন, বছরের এই সময়ে আমাদের তুমুল ব্যস্ততা থাকতে হয়। বাকি সময়ে তেমন কাজ থাকে না। তখন অন্যরা অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সবকিছুর দাম এখন আকাশচুম্বী। তা ছাড়া অনেকে এখন মেশিন দিয়ে কাজ করে। মেশিনে তিনজন মজুরের জায়গায় দুজন লাগে।
প্রতিমা নির্মাণ করছিলেন দুলাল পাল (৪২)। তিনিও পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে এই পেশায় এসেছেন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম-আমার বাবা, ঠাকুর দাদারা প্রতিমা তৈরি করে রাতদিন পার করতেন। তাদের কাছ থেকে আমিও শিখেছি। তারা এখন বেঁচে নেই। তাই এখন আমিই সংসারে হাল ধরেছি।
প্রতিমা তৈরিতে কেমন খরচ হচ্ছে এবং আগের তুলনায় পারিশ্রমিক বেড়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে রাখাল পাল নামে আরেকজন মৃৎশিল্প বলেন, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বেড়েছে। প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত এক বস্তা মাটির (৫০ কেজির) দাম দুই-আড়াই হাজার টাকা। আছে পরিবহন খরচ। আগে যে খড়ের গাদা ৪০০ টাকা ছিল, এখন তার দাম ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। ১৫০ টাকার সুতলির বান্ডেল ২০০-২২০ টাকা, ২০০ টাকার বাঁশ এখন পাঁচশত টাকা। তবে সব কিছুর দাম বাড়লেও আমাদের পারিশ্রমিক কিন্তু বাড়েনি।
আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে পূজা শুরু হবে। পাঁচ দিনব্যাপী পূজা মহাদশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। যদিও আগামী ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়বে। ২৮ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী, ২৯ সেপ্টেম্বর সপ্তমী, ৩০ সেপ্টেম্বর অষ্টমী, ১ অক্টোবর নবমী, ২ অক্টোবর বিজয় দশমীর মধ্য দিয়ে ৫ দিনব্যাপী এই দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে।