সর্বশেষ সংবাদ :

চলনবিলে ঐতিহ্যের নৌকা বাইচ

চাটমোহর প্রতিনিধি: পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী জেলায় দেশের সর্ববৃহৎ বিল ‘চলনবিল’। ১২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে পাবনার চাটমোহর উপজেলার পার্শ্ববর্তী গুরুদাসপুরে চলনবিলে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। এ সময় বিলপাড় জুড়ে নামে দর্শনার্থীদের ঢল।
‘আল্লাহ রাসুলের নাম লইয়া নাও খোলো রে, সোনার নায়ে পবনের ধর রে, হেইয়াবোল-হেইয়াবোল, হেইয়া’ সহ নানা শ্লোক গাইতে গাইতে আর বৈঠার শব্দে ছন্দ তোলে নৌকার দল, দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয় আশপাশ। প্রায় ৪০ বছর পর এমন আয়োজন গ্রামীণ বাংলায় যেন এক উৎসবে রূপ নেয়।
নাটোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশা এলাকায় এই নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। ‘নদীদূষণ রোধ করি, নির্মল বাংলাদেশ গড়ি’- এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতাটি বিলশা মা জননী সেতু থেকে তাড়াশের কুন্দইল বাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার জলপথে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আজিম উদ্দিন, ডিআইজি শাহজাহান আলী, নাটোরের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা আফরোজ সহ গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং আশপাশের জেলার প্রায় লক্ষাধিক নারী, শিশু, পুরুষ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সবাই এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে বিলপাড়ে উপস্থিত হন।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, প্রথম ধাপে পাবনা-নাটোর সিরাজগঞ্জের ২১টি বড়-মাঝারি নৌকা নিবন্ধিত হয়। সেখান থেকে বাছাই করা ১২টি নৌকা বিভিন্ন ধাপে প্রতিযোগিতা করে। প্রতিটি নৌকা বাদ্য-বাজনা ও নানা সাজসজ্জায় ঝলমল করছিল।
বিলশা মা জননী সেতু থেকে রুহাই হয়ে পিপলা গ্রাম পর্যন্ত দর্শকের ঢল নামে। আব্দুল কাদের নামে এক দর্শনার্থী জানান, ‘আমি জীবনে প্রথমবার নৌকা বাইচ দেখলাম। নৌকার সাজ, পানির ঢেউ আর মানুষের উচ্ছ্বাস সবকিছু মিলিয়ে এটা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’
সিরাজগঞ্জে তাড়াশ থেকে আসা আতিকুল ইসলাম জানান, ফেসবুকে খবর দেখে ভোরে রওনা দিই। গ্রামীণ ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।’
প্রতিযোগিতার শেষ ধাপের লড়াইয়ে ‘নিউ একতা এক্সপ্রেস’ নৌকা চ্যাম্পিয়ন হয়। রানারআপ হয় ‘বাংলার বাঘ’ এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে ‘আল মদিনা’। বিজয়ীদের মধ্যে প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় পুরস্কার একটি ফ্রিজ এবং তৃতীয় পুরস্কার স্মার্ট টেলিভিশন বিজয়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, ‘দীর্ঘ ৪০ বছর পর চলনবিলের মূল পয়েন্টে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হলো। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ, র‌্যাব, সেনা সদস্য, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেছেন। তিন দিন আগেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল।’
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ‘এবারের নৌকা বাইচ কেবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি চলনবিলের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক মহৎ উদ্যোগ।’
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, ‘চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দীর্ঘ ৪০ বছর পর পুনরায় শুরু হলো। নৌকা বাইচ, শিক্ষা উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব সব কিছুর লক্ষ্য একটাই, নতুন প্রজন্মকে সুস্থ দেহ ও সুন্দর মন নিয়ে প্রগতিশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এটি শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নদীর ঢেউ, বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে চলনবিলের আকাশ-বাতাস। আর তার সঙ্গে ফিরেছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক প্রাণের ঐতিহ্য।


প্রকাশিত: September 14, 2025 | সময়: 3:45 am | সুমন শেখ

আরও খবর