, , ।
সবুজ ইসলাম :
রাজশাহীকে দূর্যোগ-সহনশীল আধুনিক নগর গড়তে মাস্টারপ্লান হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউক) এর উদ্যোগে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ২০২২ থেকে ২০৪১ সাল মেয়াদী দুর্যোগ ঝুঁকি সংবেদনশীল মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে।
এতে রাজশাহী মহানগরী সহ জেলার দুই পৌরসভা (নওহাটা ও কাটাখালি) এবং ১১ টি ইউনিয়নের ৩৬৫.৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই পরিকল্পনায় ভূমিকম্প, বন্যা, খরা ও অগ্নিকাণ্ডসহ বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । যার ভিতরে রয়েছে বাণেশ্বর, বড়গাছি, বেলপুকুর, দামকুড়া, হড়গ্রাম, হরিয়ান, হরিপুর, হুজুরিপাড়া, পারিলা, সলুয়া ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন।
মাস্টারপ্লানে দ্রুত নগরায়ন এবং ক্রমাগত প্রাকৃতিক জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ প্ল্যান ২০৪১, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নগরীর বিভিন্ন সমস্য চিহিত করে তা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে কৃষি জমি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক স্থাপনায় ভূমি ব্যবহার ১৭ টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনার মধ্যে কৃষি (৩১.৫৭ শতাংশ), আবাসিক (৩১.৪৮ শতাংশ) ও জলাশয় (১৩.৫৮ শতাংশ) সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। এছাড়া প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদন, পাবলিক ইউটিলিটি, সড়ক নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন খাতের জন্য নির্দিষ্ট জমি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এছাড়াও দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণে আলাদা আলাদা অঞ্চলে নগরীকে বিভক্তি করা হয়েছে। এতে ৭.১৭ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্প অঞ্চল এবং ৪.৫৪ শতাংশ এলাকা বন্যা প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি জমি রক্ষায় অনিয়ন্ত্রিত রূপান্তর নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় সংরক্ষণ, নতুন সড়ক নির্মাণ ও প্রশস্তকরণ, শিল্পোন্নয়নে বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং বিনোদন এলাকার সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। শিল্প এলাকা নগরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দূষণ ও শ্রমিক অসন্তোষ কমানোর পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত।
রাউকের মাস্টারপ্লানে ১৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আকাশলীনা আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। নগরীর বাইপাস মহাসড়কের সাথে বাড়ইপাড়া ও খিরশিন মৌজায় ১৯.৮৯ একর জমির উপর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
এছাড়াও নগরীর বিমানবন্দর রোড় (শালবাগান মোড়) হতে বাইপাস সংযোগ সড়ক পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হবে। যেখানে ২৪১ কোটি ২০ লক্ষ্য টাকা ব্যয়ে সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিং এবং আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হবে। যেখানে সড়কের ভিতরে আলাদাভাবে পানি, গ্যাস এবং টিএন্ডটি লাইন স্থাপন করা হবে যাতে ভবিষ্যতে আর সড়ক না ভাঙতে হয়।
মাস্টারপ্লানে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল উন্নয়ন ও বর্ধিতকরণ করা হবে। বর্তমান টার্মিনালে বর্ষার সময়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বাস র্টামিনালের কাজ শেষ হলে আধুনিক পার্কিং সহ অত্যধুনিক স্থাপনা পাবে রাজশাহীবাসী। এছাড়াও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউক) জনগণের সেবা আরো সহজে এবং দ্রুত পাওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান ৫ম তলা ভবন থেকে ১০ম তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হবে। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
এর আগে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউক) এর বাস্তবায়নে রাজশাহী গ্রেটার রোড হতে রাজশাহী বাইপাস সড়ক পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, সাহেব বাজার হতে গৌরহাঙ্গা মোড় পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ ও প্রশস্থকরণ করা হয়েছে, কোর্ট হতে বাইপাস রোড পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্তকরণ, নাটোর রোড (রুয়েট) হতে রাজশাহী বাইপাস রোড পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্থকরণ, ফায়ার ব্রিগেডের মোড় হতে গ্রেটার রোড হয়ে রাজশাহী বাইপাস রোড পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, পোস্টাল একাডেমী হতে বুধপাড়া পর্যন্ত রাস্তাটির এ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তিত হয়ে পোস্টাল একাডেমী হতে বুধপাড়া পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়াও পরিকল্পিত নগরায়নের লক্ষ্যে শহরের আবাসন সমস্যা নিরসনের আরডিএ নিয়েছে নানা উদ্যেগ। যার মধ্যে রয়েছে, চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকা উন্নয়ন। বনলতা বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারণ ও আবাসিক এলাকা উন্নয়ন, বারনই আবাসিক এলাকা উন্নয়ন, প্রান্তিক আবাসিক এলাকা উন্নয়ন করা হয়েছে। যেখানে রয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট।
রাজশাহীকে আধুনিক বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আরডিএ কাজ করছে জানিয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউক) এর চেয়ারম্যান এস.এম তুহিনুর আলম বলেন, “এটি শুধু একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়; এটি রাজশাহীর মানুষের নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল নগরী গড়ে তোলার রোডম্যাপ।
পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হলে রাজশাহী হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম দুর্যোগ-সহনশীল ও টেকসই নগর।”
তবে নগর বিশেজ্ঞরা মনে করেন, দুর্যোগ ঝুঁকি কমিয়ে নিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এই তিনটি দিক সমন্বয় করে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান ভবিষ্যতে রাজশাহীর নগর জীবনকে করবে আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ।
সানশাইন /শামি